০৮:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের ৭ দিন পরও ৭ প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
  • ৫২ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব মধ্য এশিয়া থেকে ইউরোপের সীমান্ত পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। পেন্টাগন এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘এপিক ফিউরি’ আর ইসরায়েল একে ডাকছে ‘রোরিং লায়ন’ নামে। সপ্তাহজুড়ে চলা এই ধ্বংসযজ্ঞের পর এখন জনমনে বড় কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাতটি প্রশ্ন নিয়ে গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।
১. এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কী : দশককাল ধরে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। হিজবুল্লাহ ও হুতির মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মাধ্যমে তেহরান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করছিল। গত শনিবার পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চললেও হঠাৎ করেই তা ভেস্তে যায় এবং বোমাবর্ষণ শুরু হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন সেই পথেই হাঁটল।

২. ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী : হামলার লক্ষ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন’ করতে চান। গত শুক্রবার তিনি তেহরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন। অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন- এর আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতার পরিবর্তন। এমনকি ইরানের ভেতরে থাকা কুর্দি বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধানোর একটি প্রচ্ছন্ন ছকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

৩. বেসামরিক হতাহতের চিত্র কেমন : ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতে, গত এক সপ্তাহে দেশটিতে ১২৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিশুর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। এ ছাড়া লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২১৭ জন নিহত এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পাল্টা হামলায় ১২ জন ইসরায়েলি এবং ৬ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

৪. ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কে দিচ্ছেন : যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ দেশ চালাচ্ছে। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বড় ভয় হলো- রাষ্ট্রীয় কাঠামো যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরি হতে পারে।

৫. ইরান কতদিন প্রতিরোধ গড়তে পারবে : প্রথাগত সমরাস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ না হলেও ইরান ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা ছায়াযুদ্ধ পারদর্শী। ইতোমধ্যে তারা হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিমান চলাচলে বড় বিপর্যয় তৈরি করেছে।

৬. উপসাগরীয় দেশগুলো কি নিরপেক্ষ থাকবে : সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ইরানকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চাইছে না। তবে তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

৭. এই যুদ্ধ কি বৈধ : আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একে ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আকাশ থেকে বোমা ফেলে সরকার পরিবর্তন করার তত্ত্বে আমরা বিশ্বাস করি না।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধের ৭ দিন পরও ৭ প্রশ্ন

Update Time : ০২:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব মধ্য এশিয়া থেকে ইউরোপের সীমান্ত পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। পেন্টাগন এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘এপিক ফিউরি’ আর ইসরায়েল একে ডাকছে ‘রোরিং লায়ন’ নামে। সপ্তাহজুড়ে চলা এই ধ্বংসযজ্ঞের পর এখন জনমনে বড় কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাতটি প্রশ্ন নিয়ে গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।
১. এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কী : দশককাল ধরে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। হিজবুল্লাহ ও হুতির মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মাধ্যমে তেহরান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করছিল। গত শনিবার পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চললেও হঠাৎ করেই তা ভেস্তে যায় এবং বোমাবর্ষণ শুরু হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন সেই পথেই হাঁটল।

২. ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী : হামলার লক্ষ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন’ করতে চান। গত শুক্রবার তিনি তেহরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন। অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন- এর আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতার পরিবর্তন। এমনকি ইরানের ভেতরে থাকা কুর্দি বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধানোর একটি প্রচ্ছন্ন ছকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

৩. বেসামরিক হতাহতের চিত্র কেমন : ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতে, গত এক সপ্তাহে দেশটিতে ১২৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিশুর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। এ ছাড়া লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২১৭ জন নিহত এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পাল্টা হামলায় ১২ জন ইসরায়েলি এবং ৬ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

৪. ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কে দিচ্ছেন : যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ দেশ চালাচ্ছে। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বড় ভয় হলো- রাষ্ট্রীয় কাঠামো যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরি হতে পারে।

৫. ইরান কতদিন প্রতিরোধ গড়তে পারবে : প্রথাগত সমরাস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ না হলেও ইরান ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা ছায়াযুদ্ধ পারদর্শী। ইতোমধ্যে তারা হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিমান চলাচলে বড় বিপর্যয় তৈরি করেছে।

৬. উপসাগরীয় দেশগুলো কি নিরপেক্ষ থাকবে : সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ইরানকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চাইছে না। তবে তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

৭. এই যুদ্ধ কি বৈধ : আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একে ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আকাশ থেকে বোমা ফেলে সরকার পরিবর্তন করার তত্ত্বে আমরা বিশ্বাস করি না।’