সবুজদিন রিপোর্ট।।
কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চাইলে ৭২-এর সংবিধান বাতিল করতে হবে। সংবিধানে একদিকে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক বলা হলেও, অন্যদিকে সংবিধানকেই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করে। এ সময় একাত্তর নিয়ে কোনো আপস বা নেগোসিয়েশনের সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্জন-ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
undefined
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির আয়োজনে সংলাপে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো এত বড় একটি ঘটনা ঘটবে, এমনটি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। হঠাৎ করেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি; এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেকুলার ও দক্ষিণপন্থী ধারার মধ্যে ঐক্যের সেতুবন্ধন তৈরি না হবে, ততক্ষণ একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে না।’’
প্রচলিত ধারণা ও পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা ভুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘একটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং শেখ হাসিনার আমলের সংবিধান বহাল রেখে প্রকৃত অর্থে সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়। সংবিধানকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। যদি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবৈধ বলা হয়, তাহলে একই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপির সরকারকেও অবৈধ বলতে হবে।’’
সংলাপে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস. মুরশিদ বলেন, ‘‘১৯৭১ ও ২০২৪ উভয় চেতনাকেই ধারণ করে সামনে এগোতে হবে। একটি সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার বিষয়। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।’’
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার করতে না পারা অন্তর্বর্তী সরকারের কালেক্টিভ ফেইলিওর। জুলাইয়ের আন্দোলন হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; ২০১৮ সালের পর থেকে ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল এটি। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সংস্কার উদ্যোগ রাজনৈতিক অসহযোগিতার মুখে পড়েছে। সরকার আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারত বলেও তিনি এ সময় মন্তব্য করেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতার আলোচনা বেশি হচ্ছে। শেখ হাসিনার পলায়নের পর অবদান নিয়ে বিতর্ক তুলে যারা জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টি করেছে, ব্যর্থতার সিংহভাগ দায় তাদেরই নিতে হবে। ৫ আগস্টের পর দুটি সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরে বিএনপি সরকার। রাষ্ট্র সংস্কার ও মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে উভয় সরকারকেই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
এ সময় তিনি বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসের সঙ্গে তুলনামূলক মূল্যায়ন করে এবি পার্টি আরেকটি সংলাপের আয়োজন করবে বলে জানান। এবং শক্তি প্রয়োগ করে সমালোচনার কণ্ঠরোধের চেষ্টাকে খুবই দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তা সরকারের জন্য হিতে বিপরীত হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মঞ্জু বলেন, সমালোচনা করলেই কণ্ঠরোধ করবেন তা মেনে নেওয়া হবে না। কণ্ঠরোধ করে কখনো দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা যায় না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন সবই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘জুলাই ব্যর্থ হয়েছে’ এ ধরনের বক্তব্য একটি পরিকল্পিত বয়ানের অংশ। মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড় করানো পরাজিত শক্তির প্রচারণা। তিনি বলেন, অবদান নিয়ে প্রতিযোগিতা করা স্বার্থপরতা ও রাজনৈতিক অভদ্রতা। জুলাইয়ের মাধ্যমে জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর নানা অপপ্রচারের অবসান ঘটেছে। কোনো বিপ্লবই শতভাগ অর্জন বাস্তবায়ন করতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এফসিএ, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, পাঠাগার ও গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন রমিজসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
Reporter Name 











