নিজস্ব প্রতিবেদক||
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর অবশেষে নতুন বাস্তবতায় শুরু হলো বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়। সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের পরেও গণতান্ত্রিক যাত্রায় ছেদ পড়েছিল। বিশেষ করে বিগত তিন নির্বাচনে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশিত সংসদ গঠিত হয়নি। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আজ থেকে দেশে আবার কাক্সিক্ষত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, তাদের আত্মত্যাগের পথ ধরেই জনগণের ভোটে জবাবদিহিমূলক একটি সত্যিকার প্রতিনিধিত্বশীল সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন। বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। এরপর সূচনা বক্তব্য দেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর, সেই সময়ে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন বলে স্পিকারের চেয়ারের পাশে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির চেয়ার। স্বাগত বক্তব্যে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না আর হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অবশেষে আজ থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সত্যিকার অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদ।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আজ আমাদের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সংবিধান এবং সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিবিধান অনুসরণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য আমি প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং পাঁচবারের মতো নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করছি। আমাদের সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করলে তাকে সমর্থন জানান বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর জামায়াতের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আমরা এই নামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে আগে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হতো। সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারি দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতে চতুর্থ তলায় যান। এই সময়ে সভাপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতির আসন গ্রহণের পর সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান। তিনি স্বাগত বক্তব্য দেন।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণ নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। চ্যালেঞ্জিং এই পরিস্থিতিতে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন শেষে সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হেসেন অধিবেশন আধা ঘণ্টার জন্য মুলতবি করে সালাম জানিয়ে বিদায় নেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান। দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার আসনে বসেন। তিনি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ অন্য সব সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়ে নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। এরপর দিনের কর্মসূচি শুরু করতে গিয়ে স্পিকার মাইক অন করলেও তা কাজ করছিল না। পরে হ্যান্ডমাইকে তিনি কথা বলা শুরু করেন। এ সময় জোহরের আজান শুরু হলে স্পিকার ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। প্রায় ৩০ মিনিট পরে অধিবেশন শুরু হয়।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের বৈঠক পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বিগত দিনে মৃত্যুবরণকারী সংসদ সদস্য ও জাতীয়, আন্তর্জাতিক নেতাদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালেও হেডফোনে বক্তব্য শুনতে পাচ্ছিলেন বলে জানান অনেক সংসদ সদস্য। এরপর উপস্থাপন পর্বে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করেন। পরে সংসদ সংশ্লিষ্ট চারটি কমিটি গঠন করা হয়। এরপর বিকাল পৌনে ৪টার দিকে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে সংসদে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় ৫ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণকালে টেবিল চাপড়িয়ে তার বক্তব্যকে স্বাগত জানান বিএনপির সংসদ সদস্যরা। রাষ্ট্রপতির প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণ শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। পরে অধিবেশন আগামী রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের আগে সবশেষ সংসদ অধিবেশন শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। এরপর ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
Reporter Name 
















