১২:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক চুক্তি, জার্মানির কাছ থেকে কিনছে ১২টি সাবমেরিন

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৪:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • ৭ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। দেশের নৌবাহিনীর জন্য ১২টি অত্যাধুনিক সাবমেরিন নির্মাণে জার্মান প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস-কে (থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস) বেছে নিয়েছে অটোয়া। মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পখাতও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার।

সোমবার (৬ জুলাই) কানাডার নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে এ ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আরও অস্থিতিশীল ও বিভক্ত হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের বিকল্প নেই।

কার্নির ভাষ্য, ‘আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত বিশ্বে কানাডাকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তি দ্রুত, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি।’

যদিও চুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যয় এখনো প্রকাশ করেনি কানাডা সরকার, তবে এটি দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ক্রয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনই টিকেএমএস-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা শুরু হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

কার্নি বলেন, এই প্রকল্প শুধু নতুন সাবমেরিন কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কানাডার শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে কানাডার নৌবাহিনীর হাতে থাকা ভিক্টোরিয়া-শ্রেণির সাবমেরিন বহর অনেকটাই পুরোনো। ১৯৯৮ সালে কেনা এই সাবমেরিনগুলোর মধ্যে বর্তমানে মাত্র চারটির একটিই কার্যকরভাবে সমুদ্রে পরিচালনার উপযোগী বলে জানিয়েছে সরকার। ফলে নতুন বহর সংগ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল।

বিশ্বের দীর্ঘতম উপকূলরেখার দেশ কানাডা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিকের বরফ দ্রুত গলতে থাকায় নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে, যা বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। নতুন সাবমেরিনগুলো বরফাচ্ছন্ন পানির নিচেও অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে, যা আর্কটিকে কানাডার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে।

জার্মান প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবমেরিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এই দরপত্রে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হানওয়া ওশিয়েন।

টিকেএমএস জানিয়েছে, নরওয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে দেওয়া তাদের প্রস্তাব কানাডাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ, ন্যাটো-সমন্বিত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সমাধান দেবে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও যৌথ পরিচালনায়ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী কার্নির প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউট-এর সভাপতি ডেভিড পেরি বলেন, কার্নি খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

তার মতে, নতুন বহর চালু হলে কানাডার সমুদ্র নিরাপত্তা সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যেখানে কার্যকরভাবে একটি সাবমেরিনও নিয়মিত মোতায়েন রাখা কঠিন, সেখানে ভবিষ্যতে অন্তত তিনটি সাবমেরিন একই সময়ে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন প্রধানমন্ত্রী কার্নি ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। সেখানে সদস্য দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ থাকার কথা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

ক্ষমতায় আসার পর কার্নি ইতোমধ্যে কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয় ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন। পাশাপাশি, ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সাবমেরিন প্রকল্প সেই বৃহৎ প্রতিরক্ষা কৌশলেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার লক্ষ্য কানাডার সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে সার্বভৌম উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক চুক্তি, জার্মানির কাছ থেকে কিনছে ১২টি সাবমেরিন

Update Time : ১২:০৪:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। দেশের নৌবাহিনীর জন্য ১২টি অত্যাধুনিক সাবমেরিন নির্মাণে জার্মান প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস-কে (থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস) বেছে নিয়েছে অটোয়া। মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পখাতও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার।

সোমবার (৬ জুলাই) কানাডার নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে এ ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আরও অস্থিতিশীল ও বিভক্ত হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের বিকল্প নেই।

কার্নির ভাষ্য, ‘আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত বিশ্বে কানাডাকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তি দ্রুত, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি।’

যদিও চুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যয় এখনো প্রকাশ করেনি কানাডা সরকার, তবে এটি দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ক্রয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনই টিকেএমএস-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা শুরু হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

কার্নি বলেন, এই প্রকল্প শুধু নতুন সাবমেরিন কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কানাডার শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে কানাডার নৌবাহিনীর হাতে থাকা ভিক্টোরিয়া-শ্রেণির সাবমেরিন বহর অনেকটাই পুরোনো। ১৯৯৮ সালে কেনা এই সাবমেরিনগুলোর মধ্যে বর্তমানে মাত্র চারটির একটিই কার্যকরভাবে সমুদ্রে পরিচালনার উপযোগী বলে জানিয়েছে সরকার। ফলে নতুন বহর সংগ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল।

বিশ্বের দীর্ঘতম উপকূলরেখার দেশ কানাডা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিকের বরফ দ্রুত গলতে থাকায় নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে, যা বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। নতুন সাবমেরিনগুলো বরফাচ্ছন্ন পানির নিচেও অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে, যা আর্কটিকে কানাডার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে।

জার্মান প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবমেরিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এই দরপত্রে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হানওয়া ওশিয়েন।

টিকেএমএস জানিয়েছে, নরওয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে দেওয়া তাদের প্রস্তাব কানাডাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ, ন্যাটো-সমন্বিত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সমাধান দেবে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও যৌথ পরিচালনায়ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী কার্নির প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউট-এর সভাপতি ডেভিড পেরি বলেন, কার্নি খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

তার মতে, নতুন বহর চালু হলে কানাডার সমুদ্র নিরাপত্তা সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যেখানে কার্যকরভাবে একটি সাবমেরিনও নিয়মিত মোতায়েন রাখা কঠিন, সেখানে ভবিষ্যতে অন্তত তিনটি সাবমেরিন একই সময়ে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন প্রধানমন্ত্রী কার্নি ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। সেখানে সদস্য দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ থাকার কথা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

ক্ষমতায় আসার পর কার্নি ইতোমধ্যে কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয় ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন। পাশাপাশি, ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সাবমেরিন প্রকল্প সেই বৃহৎ প্রতিরক্ষা কৌশলেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার লক্ষ্য কানাডার সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে সার্বভৌম উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করা।