সবুজদিন রিপোর্ট।।
বাগেরহাটে ৬০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুমিরশূন্য হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিটি। খানজাহান আলী (রহ.) এর সময় থেকে বয়ে চলা ঐতিহ্য না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মাজারের খাদেম, স্থানীয় দোকানদার ও বাসিন্দারা। প্রয়োজনে মাজারের দিঘিতে ফেন্সিং করে কুমির ফিরিয়ে আনার দাবি মাজার সংশ্লিষ্টদের। কুমিরশূন্য দিঘিতে কুমির ফেরাতে প্রয়োজনে আন্দোলনে নামবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
জানা যায়, ১৪৫৯ সালে মৃত্যুর আগে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) নিজেই মাজারের দিঘিতে কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড় নামে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন। এরপর তাদের বংশধরের মধ্যে পুরুষ কুমিরটি ‘কালা পাহাড়’ আর স্ত্রী কুমিরটিকে ‘ধলা পাহাড়’ নামে ডাকা হতো। তাদের সর্বশেষ বংশধরের মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
এর আগে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। কিন্তু এর কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ যে দুটি ছিল, তার একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। এরপর থেকে একটি কুমিরই দিঘিতে ছিল। সর্বশেষ কুমিরের আক্রমণে ফাতেমা আক্তার নামের এক শিশু মারা যাওয়ায় বুধবার (৩ জুন) কুমিরটি খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাজারের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই দিঘিতে কুমির দেখছি। কুমির আমাদের ঘাটেই ডিম পাড়ে। পাড়ে উঠে ছাগল খায়, হাঁস মুরগি খায়, আগে পরে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে কামড়িয়েছে। কিন্তু এরকমটা ইতিহাসে কখনো দেখিনি যে কুমিরের আক্রমণে মানুষ মারা গেছে বলে দিঘি থেকে কুমির উঠিয়ে নিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬০০ বছর ধরে আমাদের এই দিঘিতে কুমির রয়েছে। এখন আমাদের এই দিঘিতে কোনো কুমির নেই। এইটা আমরা মানতেই পারছি না। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে যখন মানুষ মারা যায়, তখন তো বাঘ ধরে খালি করে দেওয়া হয় না। তাহলে কেন এই দিঘির কুমিরটি নিয়ে গেল?’
বরিশাল থেকে আসা দর্শনার্থী আসমা আক্তার বলেন, ‘আমি আগেও এখানে এসে কুমির দেখেছি। আজ এসে শুনি কুমির নিয়ে গেছে। কুমিরটি একটি শিশুকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। বিষয়টা দুঃখজনক। আমি চাই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কুমিরটি ফেরত আনা হোক। কুমিরটি এই মাজার ও দিঘির ঐতিহ্য।’
দিঘির কুমিরের সঙ্গে সখ্য গড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসা স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান তপু বলেন, ‘কুমিরটির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নিজ হাতে ধলাপাহাড়কে (কুমির) বন বিভাগের হাতে তুলে দিলাম। খুবই কষ্ট লাগছে। আমার জন্য এইটা খুবই হৃদয়বিদারক। ৬০০ বছর ধরেই এই দিঘিতে কুমির ছিল। খানজাহান আলীর ঐতিহ্য এই কুমির। আজ এই দিঘিতে কোনো কুমির নেই। খুবই শূন্য শূন্য লাগছে। ৬০০ বছরে এই প্রথম দিঘিটি কুমিরশূন্য রয়েছে। সরকারের প্রতি আমার আবেদন থাকবে প্রয়োজনে ফেন্সিং (বেড়া) করে মাজারের দিঘির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার।’
মাজারের খাদেম জামাল হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন মাজারের বিভিন্ন রকম ঐতিহ্য থাকে। আমাদের খানজাহান আলী (রহ.) এর ঐতিহ্য দিঘির এই কুমির। দুর্ঘটনার কারণে আমাদের এই মাজার থেকে কুমিরটি নিয়ে গেছে। দিঘি কুমিরশূন্য হওয়ায় খুবই খারাপ লাগছে। এখন পুনরায় দিঘিতে কুমির ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই। আমরা প্রয়োজনে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘাটে গ্রিল দিয়ে আটকিয়ে দেব।’
খানজাহান আলী (রহ.) এর মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিন আগে একটি শিশুকে কুমির আক্রমণ করে মেরে ফেলে। এ ঘটনাটির জন্য আমরা ব্যথিত। কুমির একটি হিংস্র প্রাণী। দিঘির পানি রক্ষায় খানজাহান আলী (রহ.) দিঘিতে দুটি কুমির ছাড়েন। সেই থেকে এই ৬০০ বছর পর্যন্ত দিঘিতে কুমির ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই কুমিরের দেখভাল করে আসছে। এই ইতিহাস ঐতিহ্য বাগেরহাটবাসীর।
এখানে কুমির দেখতে সব ধর্মাবলম্বীরা আসে। ঈদের সময় প্রতিদিন প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষ আসে। কিন্তু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য কুমিরটি যেভাবে নিয়ে গেছে সেটা আমরা মোটেই ভালোভাবে দেখছি না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আমরা চাই, অনতিবিলম্বে সরকার এবং প্রশাসন কুমিরটি ফিরিয়ে দিক।’
Reporter Name 





















