০৬:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর মুখ ও মুখোশ’-এর মুক্তির ৭০ বছর পূর্তি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৩২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ Time View

সবুজদিন বিনোদন রিপোর্ট।।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অনন্য, ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলকের নাম মুখ ও মুখোশ’। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দেশীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে এটি মুক্তি লাভ করে, যার মধ্য দিয়ে মূলত ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল। আজ সোমবার (৩ আগস্ট) এই ঐতিহাসিক ঘটনার ঠিক ৭০ বছর পূর্ণ হলো। আজ থেকে ঠিক সাত দশক আগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রূপমহল’ সিনেমা হলে এই যুগান্তকারী চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন।

এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি নির্মাণের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অদম্য জেদ, সাহস ও বিশাল এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার গল্প। ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় দাবি করা হয়েছিল যে, এই অঞ্চলের আবহাওয়া অতিরিক্ত আর্দ্র হওয়ায় এখানে কোনোভাবেই মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। সেই ভিত্তিহীন ও হতাশাজনক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আবদুল জব্বার খান সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি বানিয়ে দেখানোর দৃঢ় প্রত্যয় ও সাহসী ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের লেখা ডাকাত’ নামক একটি জনপ্রিয় নাটকের গল্প অবলম্বনে এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য তৈরি করেন এবং নিজেই এর পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে পূর্বের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল জব্বার খান কেবল প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে কলকাতা থেকে একটি পুরোনো মডেলের ক্যামেরা ও একটি সাধারণ মানের টেপরেকর্ডার সংগ্রহ করে এই অসাধ্য সাধনের কাজ শুরু করেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য নারী শিল্পীর তীব্র অভাব দেখা দিলে, বাধ্য হয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অডিশনের মাধ্যমে অভিনেত্রী খুঁজে বের করার মতো অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছবিতে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কলকাতার পূর্ণিমা সেনগুপ্তকে চূড়ান্ত করা হয় এবং পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই ছবির মূল নায়ক আফজলের ভূমিকায় পর্দায় হাজির হন।

সীমিত বাজেটের এই ছবিটির দৃশ্যধারণের কাজ সম্পন্ন হয় বুড়িগঙ্গার কালীগঞ্জ, লালমাটিয়া, তেজগাঁও এবং টঙ্গীর তুরাগ নদীর মনোরম তীরে। এর দুর্দান্ত সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার সমর দাস এবং গানের কথায় কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাহবুবা হাসনাত ও কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী আবদুল আলীম। ছবিটি নির্মাণের পর শুরুর দিকে ঢাকার সিনেমা হলের পরিবেশকরা এটি প্রদর্শনে ব্যাপক অনীহা ও অনাগ্রহ দেখালেও, পরে দর্শকদের তুমুল আগ্রহের কারণে এটি ঢাকার রূপমহলসহ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার বিভিন্ন সিনেমা হলে একযোগে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর দর্শকদের সেই অভাবনীয় সাড়া ও উন্মাদনা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, প্রবল ইচ্ছে ও চেষ্টা থাকলে সব ধরনের প্রতিকূল বাধা পেরিয়ে এই বাংলার মাটিতেও অত্যন্ত মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

৫ সন্তানের পর অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে রোনালদো-জর্জিনা!

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর মুখ ও মুখোশ’-এর মুক্তির ৭০ বছর পূর্তি

Update Time : ০৫:৩২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

সবুজদিন বিনোদন রিপোর্ট।।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অনন্য, ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলকের নাম মুখ ও মুখোশ’। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দেশীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে এটি মুক্তি লাভ করে, যার মধ্য দিয়ে মূলত ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল। আজ সোমবার (৩ আগস্ট) এই ঐতিহাসিক ঘটনার ঠিক ৭০ বছর পূর্ণ হলো। আজ থেকে ঠিক সাত দশক আগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রূপমহল’ সিনেমা হলে এই যুগান্তকারী চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন।

এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি নির্মাণের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অদম্য জেদ, সাহস ও বিশাল এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার গল্প। ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় দাবি করা হয়েছিল যে, এই অঞ্চলের আবহাওয়া অতিরিক্ত আর্দ্র হওয়ায় এখানে কোনোভাবেই মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। সেই ভিত্তিহীন ও হতাশাজনক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আবদুল জব্বার খান সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি বানিয়ে দেখানোর দৃঢ় প্রত্যয় ও সাহসী ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের লেখা ডাকাত’ নামক একটি জনপ্রিয় নাটকের গল্প অবলম্বনে এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য তৈরি করেন এবং নিজেই এর পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে পূর্বের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আবদুল জব্বার খান কেবল প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে কলকাতা থেকে একটি পুরোনো মডেলের ক্যামেরা ও একটি সাধারণ মানের টেপরেকর্ডার সংগ্রহ করে এই অসাধ্য সাধনের কাজ শুরু করেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য নারী শিল্পীর তীব্র অভাব দেখা দিলে, বাধ্য হয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অডিশনের মাধ্যমে অভিনেত্রী খুঁজে বের করার মতো অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছবিতে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কলকাতার পূর্ণিমা সেনগুপ্তকে চূড়ান্ত করা হয় এবং পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই ছবির মূল নায়ক আফজলের ভূমিকায় পর্দায় হাজির হন।

সীমিত বাজেটের এই ছবিটির দৃশ্যধারণের কাজ সম্পন্ন হয় বুড়িগঙ্গার কালীগঞ্জ, লালমাটিয়া, তেজগাঁও এবং টঙ্গীর তুরাগ নদীর মনোরম তীরে। এর দুর্দান্ত সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার সমর দাস এবং গানের কথায় কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাহবুবা হাসনাত ও কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী আবদুল আলীম। ছবিটি নির্মাণের পর শুরুর দিকে ঢাকার সিনেমা হলের পরিবেশকরা এটি প্রদর্শনে ব্যাপক অনীহা ও অনাগ্রহ দেখালেও, পরে দর্শকদের তুমুল আগ্রহের কারণে এটি ঢাকার রূপমহলসহ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার বিভিন্ন সিনেমা হলে একযোগে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর দর্শকদের সেই অভাবনীয় সাড়া ও উন্মাদনা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, প্রবল ইচ্ছে ও চেষ্টা থাকলে সব ধরনের প্রতিকূল বাধা পেরিয়ে এই বাংলার মাটিতেও অত্যন্ত মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব।