০১:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৪৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৬ Time View

সবুজদিন রিপোর্ট।।
নাজমুল হোসেন শান্ত চেয়েছিলেন ডারউইনে তার দলের খেলোয়াড়রা পাঁচ দিন ভালো খেলুক। তার চাওয়াকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশ। মাত্র চার দিনেই ১১তম সেশনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে তারা। একেবারে ব্যাটে-বলে নিখুঁত পারফরম্যান্সের প্রদর্শনী করে দেখাল টাইগাররা। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দাপট দেখানো যে কোনো দলের জন্যই স্বপ্ন। রোববার শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতেই ৯ উইকেটে জিতে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিল বাংলাদেশ।

টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা দলের কাছে শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ফল হজম করা কঠিন হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন বহুদিন উপভোগ করার মতো। অস্ট্রেলিয়ার ডেরায় টেস্ট জয় এমনিতেই অনেক কঠিন। তার ওপর তাদের যা প্রস্তুতি ছিল, আর প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের চারজনের প্রত্যেকের ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেট, সেখানে এমন সাফল্য পাওয়া সত্যিই অসাধারণ। এই জয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে রচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্টের জন্য দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা পুরোপুরি সার্থক। ২ ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল এবং নিশ্চিতভাবে এই টেস্ট সিরিজ আর হারছে না টাইগাররা।

২৩ বছর আগে ডারউইন ও কেয়ার্নসে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশ। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফরে গেল তারা। এই ম্যাচে বাংলাদেশ লড়াই করতে পারলেই যেন প্রত্যাশা পূরণ হতো! কিন্তু ১৩ আগস্ট প্রথম দিনেই পেসাররা যেভাবে বুলডোজার চালালেন, তাতেই এক অবিস্মরণীয় জয়ের ভিত তৈরি হয়ে গেল।

দুই সেশনেরও বেশি সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশের বোলারদের দাপট চলল। দুইশ রানের আগেই অলআউট অস্ট্রেলিয়া! যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। অবশ্য ধারণা করা হচ্ছিল, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের শক্তিশালী বোলিং লাইনআপও একইভাবে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়াও হবে। কিন্তু না, ব্যাটিংয়েও চলল বাংলাদেশের দাপট। তানজিদ হাসান তামিম ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি করলেন। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজও হাফ সেঞ্চুরিতে বড় স্কোরের জন্য ভিত গড়ে দিলেন।

এই তিন ব্যাটারের অনবদ্য ব্যাটিং এবং টেল এন্ডারের উল্লেখযোগ্য অবদানে বাংলাদেশ ২২৮ রানের বড় লিড নেয় প্রথম ইনিংসে। বিদেশের মাটিতে এর আগে প্রথম ইনিংসে এত বড় লিড কখনও পায়নি তারা। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে গেল চাপ নিয়ে। এবারও হাসান জোড়া আঘাতে তাদের গলা চেপে ধরেন।

প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ, আর দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন বাংলাদেশের বোলারদের সামনে যা একটু প্রতিরোধ গড়লেন। দেশের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি করে দলকে লিড এনে দেন গ্রিন। কিন্তু বল হাতে মিরাজ দেখালেন ঘূর্ণি জাদু। তাতে লিডটা বড় হলো না। বাংলাদেশের লক্ষ্যও থাকল নাগালের মধ্যে।

প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ আজ কিছু করতে পারলেন না। তবে বিপদ বাড়তে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। জয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সহজেই সেরে নিলেন তারা। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে ৫৪ রানে অলআউট করার স্মৃতি অজিদের কিছুটা মনোবল দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু তা কোনো কাজে আসেনি। ৫৭ রানের লক্ষ্য অনায়াসে চেজ করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখল বাংলাদেশ।

জয়টাও এলো নায়কোচিতভাবে। ১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বেউ ওয়েবস্টারকে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। সাদমানের সঙ্গে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে তিনি অপরাজিত ছিলেন ৩০ রানে। সাদমান টিকে ছিলেন ২৫ রানে।

দুই ইনিংস মিলে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন হাসান মাহমুদ।

শ্রীলঙ্কা যা পারেনি, পাকিস্তান করেছে ৩০ বছর আগে– সেটাই দেখাল বাংলাদেশ

১৯৮৮ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে সবমিলিয়ে সাতবার সফর করে ১৫টি টেস্ট খেললেও অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও কুমার সাঙ্গাকারার দল জয়ের স্বাদ পায়নি। আর পাকিস্তান চারবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট জিতলেও সর্বশেষ জয় ১৯৯৫ সালে। তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়ে জিতল তাসমান পাড়ের দেশটিতে।

২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ডারউইন ও কেয়ার্নসে খেলা দুটি ম্যাচেই লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। ২৩ বছর পর বাংলাদেশ টেস্ট খেলতে গিয়ে স্বাগতিকদের বিপক্ষে দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিলো।

শ্রীলঙ্কার ৩৯ বছরের অপেক্ষার মাঝে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সফরে গিয়েই অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয়ের স্বাদ পেল। যা বিদেশের মাটিতে তাদের দশম জয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের টেস্ট জেতা ষষ্ঠ দেশ অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের দাপটের পর তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত’র ৮৪ রানের অনবদ্য ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদি হাসান মিরাজের ফাইফার ও হাসানের ৩ উইকেট মিলিয়েই বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় এই অধ্যায় রচনা করল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

Update Time : ১২:৪৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

সবুজদিন রিপোর্ট।।
নাজমুল হোসেন শান্ত চেয়েছিলেন ডারউইনে তার দলের খেলোয়াড়রা পাঁচ দিন ভালো খেলুক। তার চাওয়াকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশ। মাত্র চার দিনেই ১১তম সেশনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে তারা। একেবারে ব্যাটে-বলে নিখুঁত পারফরম্যান্সের প্রদর্শনী করে দেখাল টাইগাররা। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দাপট দেখানো যে কোনো দলের জন্যই স্বপ্ন। রোববার শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতেই ৯ উইকেটে জিতে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিল বাংলাদেশ।

টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা দলের কাছে শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ফল হজম করা কঠিন হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন বহুদিন উপভোগ করার মতো। অস্ট্রেলিয়ার ডেরায় টেস্ট জয় এমনিতেই অনেক কঠিন। তার ওপর তাদের যা প্রস্তুতি ছিল, আর প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের চারজনের প্রত্যেকের ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেট, সেখানে এমন সাফল্য পাওয়া সত্যিই অসাধারণ। এই জয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে রচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্টের জন্য দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা পুরোপুরি সার্থক। ২ ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল এবং নিশ্চিতভাবে এই টেস্ট সিরিজ আর হারছে না টাইগাররা।

২৩ বছর আগে ডারউইন ও কেয়ার্নসে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশ। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফরে গেল তারা। এই ম্যাচে বাংলাদেশ লড়াই করতে পারলেই যেন প্রত্যাশা পূরণ হতো! কিন্তু ১৩ আগস্ট প্রথম দিনেই পেসাররা যেভাবে বুলডোজার চালালেন, তাতেই এক অবিস্মরণীয় জয়ের ভিত তৈরি হয়ে গেল।

দুই সেশনেরও বেশি সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশের বোলারদের দাপট চলল। দুইশ রানের আগেই অলআউট অস্ট্রেলিয়া! যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। অবশ্য ধারণা করা হচ্ছিল, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের শক্তিশালী বোলিং লাইনআপও একইভাবে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়াও হবে। কিন্তু না, ব্যাটিংয়েও চলল বাংলাদেশের দাপট। তানজিদ হাসান তামিম ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি করলেন। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজও হাফ সেঞ্চুরিতে বড় স্কোরের জন্য ভিত গড়ে দিলেন।

এই তিন ব্যাটারের অনবদ্য ব্যাটিং এবং টেল এন্ডারের উল্লেখযোগ্য অবদানে বাংলাদেশ ২২৮ রানের বড় লিড নেয় প্রথম ইনিংসে। বিদেশের মাটিতে এর আগে প্রথম ইনিংসে এত বড় লিড কখনও পায়নি তারা। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে গেল চাপ নিয়ে। এবারও হাসান জোড়া আঘাতে তাদের গলা চেপে ধরেন।

প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ, আর দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন বাংলাদেশের বোলারদের সামনে যা একটু প্রতিরোধ গড়লেন। দেশের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি করে দলকে লিড এনে দেন গ্রিন। কিন্তু বল হাতে মিরাজ দেখালেন ঘূর্ণি জাদু। তাতে লিডটা বড় হলো না। বাংলাদেশের লক্ষ্যও থাকল নাগালের মধ্যে।

প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ আজ কিছু করতে পারলেন না। তবে বিপদ বাড়তে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। জয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সহজেই সেরে নিলেন তারা। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে ৫৪ রানে অলআউট করার স্মৃতি অজিদের কিছুটা মনোবল দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু তা কোনো কাজে আসেনি। ৫৭ রানের লক্ষ্য অনায়াসে চেজ করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখল বাংলাদেশ।

জয়টাও এলো নায়কোচিতভাবে। ১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বেউ ওয়েবস্টারকে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। সাদমানের সঙ্গে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে তিনি অপরাজিত ছিলেন ৩০ রানে। সাদমান টিকে ছিলেন ২৫ রানে।

দুই ইনিংস মিলে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন হাসান মাহমুদ।

শ্রীলঙ্কা যা পারেনি, পাকিস্তান করেছে ৩০ বছর আগে– সেটাই দেখাল বাংলাদেশ

১৯৮৮ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে সবমিলিয়ে সাতবার সফর করে ১৫টি টেস্ট খেললেও অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও কুমার সাঙ্গাকারার দল জয়ের স্বাদ পায়নি। আর পাকিস্তান চারবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট জিতলেও সর্বশেষ জয় ১৯৯৫ সালে। তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়ে জিতল তাসমান পাড়ের দেশটিতে।

২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ডারউইন ও কেয়ার্নসে খেলা দুটি ম্যাচেই লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। ২৩ বছর পর বাংলাদেশ টেস্ট খেলতে গিয়ে স্বাগতিকদের বিপক্ষে দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিলো।

শ্রীলঙ্কার ৩৯ বছরের অপেক্ষার মাঝে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সফরে গিয়েই অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয়ের স্বাদ পেল। যা বিদেশের মাটিতে তাদের দশম জয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের টেস্ট জেতা ষষ্ঠ দেশ অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের দাপটের পর তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত’র ৮৪ রানের অনবদ্য ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদি হাসান মিরাজের ফাইফার ও হাসানের ৩ উইকেট মিলিয়েই বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় এই অধ্যায় রচনা করল।