০৮:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আল জাজিরার বিশ্লেষণ

খামেনির পতন রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৪৬:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
  • ৭৯ Time View

সবুজদিন অনলাইন ডেস্ক।।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু এবং পরবর্তী যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মস্কো একদিকে যেমন শোক ও নিন্দা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে এই অস্থিরতার আড়ালে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভাগ্যবদলের সুযোগও দেখছে। কয়েক দশক ধরে তেহরানের প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত রাশিয়া জাতিসংঘে ইরানকে সুরক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করে আসলেও বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি পুতিন প্রশাসনের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের তেল রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেলের গুরুত্ব ও চাহিদা হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য সবথেকে বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রাশিয়ার উরাল ক্রুড তেলের দাম গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতি ব্যারেল মাত্র ৪০ ডলারে নেমে এসেছিল, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে রাশিয়ার তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে। যেহেতু ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো ভারী অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি বর্তমানে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত, তাই বিশ্বের বড় বড় তেল শোধনাগারগুলো এখন রাশিয়ার উরাল তেলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাড়তি চাহিদা মস্কোকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দর কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি ক্রেমলিন এই যুদ্ধকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। অতীতে বেশ কয়েকবার পুতিন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বর্তমানের ভয়াবহ সংঘাত পরিস্থিতি রাশিয়াকে আবারও সেই কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফেরার সুযোগ করে দিতে পারে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ যখন ইউক্রেন থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের দিকে নিবদ্ধ হচ্ছে, তখন পুতিন সেই সুযোগে ইউক্রেন যুদ্ধের সেটেলমেন্ট বা নতুন কোনো এজেন্ডা নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে দেন-দরবার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পাচ্ছেন।

সামরিক দিক থেকেও রাশিয়ার জন্য এই যুদ্ধ একটি পরোক্ষ স্বস্তি বয়ে এনেছে। এটি সরাসরি ইউক্রেন রণাঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট মিসাইলগুলো এখন ইউক্রেনে পাঠানোর বদলে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সুরক্ষায় সরিয়ে নিচ্ছে। কিয়েভের সামরিক কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই প্যাট্রিয়ট মিসাইলের তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন। যা রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই কৌশলগত পরিবর্তন পুতিনের বাহিনীকে ইউক্রেন সীমান্তে আরও বেশি আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পুতিনের সামনে কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ, তাকে এখন ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে ইরান রাশিয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথেও মস্কো একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়। তবে সামগ্রিকভাবে খামেনির মৃত্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশৃঙ্খলাকে রাশিয়ার প্রচারযন্ত্র পশ্চিমা বিশ্বের ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে তুলে ধরছে। এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইউরোপে নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি হয়, তবে তা রাশিয়ার মিত্র হিসেবে পরিচিত ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোকে শক্তিশালী করবে, যা পরোক্ষভাবে ক্রেমলিনের হাতকেই শক্ত করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

খামেনির পতন রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ?

Update Time : ১০:৪৬:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

সবুজদিন অনলাইন ডেস্ক।।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু এবং পরবর্তী যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মস্কো একদিকে যেমন শোক ও নিন্দা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে এই অস্থিরতার আড়ালে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভাগ্যবদলের সুযোগও দেখছে। কয়েক দশক ধরে তেহরানের প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত রাশিয়া জাতিসংঘে ইরানকে সুরক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করে আসলেও বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি পুতিন প্রশাসনের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের তেল রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেলের গুরুত্ব ও চাহিদা হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য সবথেকে বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রাশিয়ার উরাল ক্রুড তেলের দাম গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতি ব্যারেল মাত্র ৪০ ডলারে নেমে এসেছিল, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে রাশিয়ার তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে। যেহেতু ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো ভারী অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি বর্তমানে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত, তাই বিশ্বের বড় বড় তেল শোধনাগারগুলো এখন রাশিয়ার উরাল তেলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাড়তি চাহিদা মস্কোকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দর কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি ক্রেমলিন এই যুদ্ধকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। অতীতে বেশ কয়েকবার পুতিন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বর্তমানের ভয়াবহ সংঘাত পরিস্থিতি রাশিয়াকে আবারও সেই কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফেরার সুযোগ করে দিতে পারে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ যখন ইউক্রেন থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের দিকে নিবদ্ধ হচ্ছে, তখন পুতিন সেই সুযোগে ইউক্রেন যুদ্ধের সেটেলমেন্ট বা নতুন কোনো এজেন্ডা নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে দেন-দরবার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পাচ্ছেন।

সামরিক দিক থেকেও রাশিয়ার জন্য এই যুদ্ধ একটি পরোক্ষ স্বস্তি বয়ে এনেছে। এটি সরাসরি ইউক্রেন রণাঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট মিসাইলগুলো এখন ইউক্রেনে পাঠানোর বদলে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সুরক্ষায় সরিয়ে নিচ্ছে। কিয়েভের সামরিক কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই প্যাট্রিয়ট মিসাইলের তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন। যা রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই কৌশলগত পরিবর্তন পুতিনের বাহিনীকে ইউক্রেন সীমান্তে আরও বেশি আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পুতিনের সামনে কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ, তাকে এখন ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে ইরান রাশিয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথেও মস্কো একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়। তবে সামগ্রিকভাবে খামেনির মৃত্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশৃঙ্খলাকে রাশিয়ার প্রচারযন্ত্র পশ্চিমা বিশ্বের ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে তুলে ধরছে। এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইউরোপে নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি হয়, তবে তা রাশিয়ার মিত্র হিসেবে পরিচিত ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোকে শক্তিশালী করবে, যা পরোক্ষভাবে ক্রেমলিনের হাতকেই শক্ত করবে।