খুলনা ব্যুরো।।
প্রায় ৫২ কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ সহ মোট ১০৭.৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখন ভাঙ্গনের মুখে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকার ভাঙনপ্রবণ ও দুর্বল বাঁধগুলোর কারণে উপকুলের লাখো মানুষ সবসময় জলোচ্ছ¡াস ও প্লাবনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সাতক্ষীরার বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ২৬ কিলোমিটার বা তার বেশি বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। খুলনার কয়রা পাইকগাছাসহ বিভিন্ন নদীতীরবর্তী প্রায় ১৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অরক্ষিত। বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জসহ উপকূলীয় অংশে প্রায় ১০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। জোয়ারের অতিরিক্ত চাপে পুরনো ও দুর্বল বাঁধগুলো প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও বসতভিটা ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, কালবৈশাখী, লঘুচাপ বা যেকোনো সামুদ্রিক ঝড়ে বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে উপকুলবাসী।
ঝড়-জলোচ্ছ¡াসের আশঙ্কা আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খুলনার পাইকগাছা, কয়রা, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনির মানুষ। বেড়িবাঁধের বেশিরভাগ অংশ ঝুঁকিতে থাকায় দুশ্চিন্তায় তারা। দ্রæত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি এসব এলাকার বাসিন্দাদের। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এই তিন জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রয়েছে ১০৭.৩৫ কিলোমিটার।
সূত্রমতে, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াসে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। তখন লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে, ফসল বিনষ্ট হয়। জলোচ্ছ¡াসে ভেসে যায় মাছ। একশ্রেণির প্রভাবশালী মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে নদীর নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করেন। তাছাড়া বেড়িবাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পর সৃষ্ট ছিদ্র ভরাট করেন না। ফলে কিছুদিন যেতে না যেতেই বেড়িবাঁধের অবস্থা ভঙ্গুর ও নাজুক হতে থাকে। নদীতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেই এসব স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। লোকালয়ে প্রবেশ করে লবণাক্ত পানি। এতে প্লাবিত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে চলে আসার পর টানা কয়েক বছর ফসল হয় না। মিঠাপানির মাছ ও অন্যান্য প্রকৃতিবান্ধব কীটপতঙ্গের বংশবিস্তারও বাধাগ্রস্ত হয়।
কিছু কিছু এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ¯øুইচ গেট দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় আর পানির সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় বাঁধ ভেঙে পানি বের হয়ে আসে। ষাটের দশকে নির্মাণ করা উপকূলের এই বাঁধ বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু পুননির্মাণ করা হয়নি। জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তার রিং দিয়ে বাঁধ কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। নদীতে পলি পড়ে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায়ই এসব নড়বড়ে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।
শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স¤প্রতি উপকূলীয় দুই উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরে পাউবো’র বেড়িবাঁধের অন্তত ৪০ পয়েন্টে ২০ কিলোমিটার ভাঙন ও ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর মধ্যে আশাশুনিতে মরিচ্চাপ নদীর ওপর নির্মিত তেঁতুলিয়া সেতুর পাড়ে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেতুটিও হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলে ভাঙন আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে আছেন।
এদিকে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালী ও চাকলা এলাকায় বেড়িবাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন রয়েছে। ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে আনুলিয়া ইউনিয়নের কাকবাসিয়া খেয়াঘাট এলাকায় ও বিছট গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। একই অবস্থা শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, নওয়াবেকি, হরিনগর ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে। পাউবো কর্তৃপক্ষ এসব ভাঙন পয়েন্টের কিছু কিছু স্থানে সংস্কারের কাজ করলেও সেটি বাঁধ রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ভাঙনকবলিত এলাকাবাসী।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ১০৭.৩৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৫.২২৯ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৭২.১২১ কিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা জেলায় বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ১০১৩.৪০০ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৪১.৭৭৮ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৯.৬০৯ কিলোমিটার, অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ২২.১৬৯ কিলোমিটার। বাগেরহাট জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৩৩৮ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১১.৮৪৭ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ০.৯০০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১০.৯৪৭ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৬৭১.১৭০ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৫৩.৭২৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৪.৭২০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৯.০০৫ কিলোমিটার।
বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির খুলনা বিভাগীয় মহাসচিব মো: আজগর হোসেন বলেন, ষাটের দশকের বাঁধের পরিকল্পনা বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার মানুষ সহায়-সম্বল হারাচ্ছেন ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ¡াস থেকে উপকূলের মানুষকে রক্ষা করতে হলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ সময়ের দাবি। টেকসই করতে বাঁধের মধ্যে নির্মাণ প্রয়োজন শক্তিশালী কংক্রিটের দেয়াল অথবা কনক্রিটের বøক।
Reporter Name 



















