০৭:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কিডনি , লিভার এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে

বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ৬৫ শতাংশ মানুষের জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৫০:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
  • ৩ Time View

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:

বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে সিডর আইলায় বিধ্বস্ত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকুলের বাসিন্দারা। জলাশয় কিংবা গভীর নলকূপের মতো উৎস থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে তা পানের উপযোগী নয়। সরকারের কিছু প্রকল্প চালু থাকলেও মাষ্টার প্লানের অভাব ও দীর্ঘ মেয়াদী স্থায়ী প্রকল্প গ্রহন না করায় উপকুলবাসীকে যুগের পর যুগ তীব্র সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি পান করায় কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

চারিদিকে পানি আর পানি। কিন্তু সুন্দরবন বেষ্টিত উপকুলে অর্ধকোটি মানুষ সুপেয় পানির পিপাসায় কারবালার সামিল। ফলে খুলনা সাতক্ষীরা বাগেরহাটের ৬৫ শতাংশ মানুষের জনস্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন।

উপকুলীয়াঞ্চলের মোট প্রায় ১ কোটি মানুষ আহারযোগ্য পানি পাচ্ছে না। এর মধ্যে অর্ধকোটি মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছে। ক্লাইমেট একশ্যান ফোরাম এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গবেষণা সংস্থাটি বলছেন, উপকুলীয়াঞ্চলের ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বাকী ৩৫ শতাংশ মানুষ সরকারী ও বেসরকারী সহায়তায় পাওয়া পানির ট্যাংকে বৃষ্টি পানি সংরক্ষন করে চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে এই পানি মাত্র ৪-৬ মাস পর্যন্ত ব্যবহারের উপযোগী থাকে। এরপর তাদের দুরবর্তী পুকুর অথবা লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
কাঙ্খিত বৃষ্টি না হওয়ায় খুলনার উপকূলবর্তী অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। গভীর নলক‚পে পানি উঠছে না। পানি নিয়ে রীতিমত কারবালা। উপকুলীয়াঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের সাথে সাথী হয়েছে খোদ খুলনা মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ পরিবার। তাই প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচীর মাধ্যমেই পানির আধার সৃষ্টি করাই হতে পারে পানি সংকট মোকাবেলার টনিক। দ্রæত নেমে যাওয়া পানির স্তর আবার যৌবণ ফিরে পেতে পারে। তার জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাষ্টার প্লান করে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার সাতক্ষীরা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় সব সময়ই খাওয়ার পানির সংকট থাকে। বাগেরহাটের ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮টিতে একই সমস্যা। এছাড়া খুলনা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অযাচিত ব্যবহার, ভূ-উপরস্থ পানির আধার নষ্ট ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর নেমে যায় পানির স্তর।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে মহানগরীর এক থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে পানির স্তর নেমেছে অন্তত ৩০ ফুট। ফলে গ্রীষ্মকাল এলেই গভীর নলকূপ থেকে আর পানি ওঠে না। অন্যান্য নলকূপে যে পরিমাণ পানি উঠছে, তার ভেতরে আয়রনসহ অন্যান্য রাসায়নিক ও ক্ষতিকর খনিজ পদার্থ থাকায় তা পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জালোচ্ছ¡াসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিডর, আইলা, ফনী, আম্ফান ইত্যাদি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল সংখ্যক উপকূলবাসীর ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, বৃক্ষ-বাগান, ধ্বংস হয়েছে। আরো একটা বড় ক্ষতি হয়েছে এই যে, উপকূলভাগে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলার উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বলে গণ্য হলেও যুগের পর যুগ কোনো সরকারই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

বন পরিবেশ ও জলবায়ু প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারি ট্যাংক সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রভাবশালীদের দখলে থাকা পানি সংরক্ষণের আধার উদ্ধার করা হবে। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি পুকুরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উপকূলের মানুষের চাহিদা পূরণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে এবংদ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই পানি পূরণ হতে কমপক্ষে ৬০০ বছর সময় লাগে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বড় বড় পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের মাটি ও পানির উৎসে অতিরিক্ত লবণ ঢুকে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। একই সঙ্গে প্রভাবশালীদের দখল ও ভরাটের কারণে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা দূষিত পানি পান করছে। এতে কিডনির জটিলতা, চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানা রোগ বাড়ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

পাইকগাছায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গরুর খামার পরিচালনা; খামারিকে ২ হাজার টাকা জরিমানা

কিডনি , লিভার এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে

বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ৬৫ শতাংশ মানুষের জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন

Update Time : ০৬:৫০:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:

বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে সিডর আইলায় বিধ্বস্ত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকুলের বাসিন্দারা। জলাশয় কিংবা গভীর নলকূপের মতো উৎস থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে তা পানের উপযোগী নয়। সরকারের কিছু প্রকল্প চালু থাকলেও মাষ্টার প্লানের অভাব ও দীর্ঘ মেয়াদী স্থায়ী প্রকল্প গ্রহন না করায় উপকুলবাসীকে যুগের পর যুগ তীব্র সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি পান করায় কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

চারিদিকে পানি আর পানি। কিন্তু সুন্দরবন বেষ্টিত উপকুলে অর্ধকোটি মানুষ সুপেয় পানির পিপাসায় কারবালার সামিল। ফলে খুলনা সাতক্ষীরা বাগেরহাটের ৬৫ শতাংশ মানুষের জনস্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন।

উপকুলীয়াঞ্চলের মোট প্রায় ১ কোটি মানুষ আহারযোগ্য পানি পাচ্ছে না। এর মধ্যে অর্ধকোটি মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছে। ক্লাইমেট একশ্যান ফোরাম এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গবেষণা সংস্থাটি বলছেন, উপকুলীয়াঞ্চলের ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বাকী ৩৫ শতাংশ মানুষ সরকারী ও বেসরকারী সহায়তায় পাওয়া পানির ট্যাংকে বৃষ্টি পানি সংরক্ষন করে চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে এই পানি মাত্র ৪-৬ মাস পর্যন্ত ব্যবহারের উপযোগী থাকে। এরপর তাদের দুরবর্তী পুকুর অথবা লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
কাঙ্খিত বৃষ্টি না হওয়ায় খুলনার উপকূলবর্তী অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। গভীর নলক‚পে পানি উঠছে না। পানি নিয়ে রীতিমত কারবালা। উপকুলীয়াঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের সাথে সাথী হয়েছে খোদ খুলনা মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ পরিবার। তাই প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচীর মাধ্যমেই পানির আধার সৃষ্টি করাই হতে পারে পানি সংকট মোকাবেলার টনিক। দ্রæত নেমে যাওয়া পানির স্তর আবার যৌবণ ফিরে পেতে পারে। তার জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাষ্টার প্লান করে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার সাতক্ষীরা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় সব সময়ই খাওয়ার পানির সংকট থাকে। বাগেরহাটের ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮টিতে একই সমস্যা। এছাড়া খুলনা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অযাচিত ব্যবহার, ভূ-উপরস্থ পানির আধার নষ্ট ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর নেমে যায় পানির স্তর।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে মহানগরীর এক থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে পানির স্তর নেমেছে অন্তত ৩০ ফুট। ফলে গ্রীষ্মকাল এলেই গভীর নলকূপ থেকে আর পানি ওঠে না। অন্যান্য নলকূপে যে পরিমাণ পানি উঠছে, তার ভেতরে আয়রনসহ অন্যান্য রাসায়নিক ও ক্ষতিকর খনিজ পদার্থ থাকায় তা পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জালোচ্ছ¡াসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিডর, আইলা, ফনী, আম্ফান ইত্যাদি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল সংখ্যক উপকূলবাসীর ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, বৃক্ষ-বাগান, ধ্বংস হয়েছে। আরো একটা বড় ক্ষতি হয়েছে এই যে, উপকূলভাগে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলার উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বলে গণ্য হলেও যুগের পর যুগ কোনো সরকারই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

বন পরিবেশ ও জলবায়ু প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারি ট্যাংক সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রভাবশালীদের দখলে থাকা পানি সংরক্ষণের আধার উদ্ধার করা হবে। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি পুকুরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উপকূলের মানুষের চাহিদা পূরণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে এবংদ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই পানি পূরণ হতে কমপক্ষে ৬০০ বছর সময় লাগে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বড় বড় পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের মাটি ও পানির উৎসে অতিরিক্ত লবণ ঢুকে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। একই সঙ্গে প্রভাবশালীদের দখল ও ভরাটের কারণে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা দূষিত পানি পান করছে। এতে কিডনির জটিলতা, চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানা রোগ বাড়ছে।