০৩:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৪০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ১০ Time View

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা)

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘন ঘন দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রথাগত জীবন-জীবিকা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। কৃষি ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার উপায় ও পেশায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব-দ্বীপপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ দেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন-ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা, নদী ভাঙন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এ দেশে প্রতিনিয়তই দৃশ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তন স্পষ্টতই মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তনশীল জলবায়ুর এই চক্র উপকূলে বসবাসরত সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে উপকূলে, যাদের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র উপাদান হচ্ছে কৃষি। বর্তমানে কৃষি থেকে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় তা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বিশেষত ২০৫০ সালের মধ্যে যে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে, সেটা ৮ শতাংশ এবং গম উৎপাদন কমবে ৩২ শতাংশ। যার প্রভাব পড়বে উপকূলের মানুষের জীবন জীবিকার উপর।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। আর দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও প্রকৃতি জলবায়ু ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আছে। সিডর, আইলা এবং অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চিংড়ি খামারসহ মৎস্য শিল্প এবং ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ফলস্বরূপ খামার এবং মাছ ধরার নৌকাগুলোতে দৈনিক শ্রমের সুযোগ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। কয়রা, পাইকগাছা, শ্যামনগর, আশাশুনি এলাকার লোকেরা কাজ, বিকল্প আয় এবং ইট প্রস্তুতকারক, রিকশাচালক এবং শ্রমিক হিসেবে কর্মসংস্থানের জন্য অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীর বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান গাজী জানান, মাছের ঘেরে ও কৃষি কাজ করে সংসার চলছে না তাই খুলনা শহরে রিকশা চালিয়ে সংসারে খরচ বহন করছি।

উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় যেসব বড় পরিবর্তন আসছে। লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে লবণ-সহিষ্ণু জাতের ধান, তরমুজ বা শাকসবজি চাষে ঝুঁকছেন। মাছ শিকারিরা গভীর সমুদ্রে দুর্যোগের ঝুঁকি ও মাছের আকাল দেখে কাঁকড়া চাষ বা দিনমজুরিতে পেশা পরিবর্তন করছেন। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে মিষ্টি পানির পুকুর বা ঘেরে মাছ চাষ কঠিন হয়ে পড়েছে। এর বিকল্প হিসেবে উপকূলের অনেক এলাকায় এখন কুঁচে মাছ ও কাঁকড়া চাষের প্রসার ঘটেছে।

দুর্যোগে পুরুষরা কর্মহীন হয়ে পড়লে নারীরা বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন ও কাঁকড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তেমনি পেশাও বদলে যাচ্ছে। পাইকগাছার গোপালপুর গ্রামের করিম গাজী বলেন, অল্প একটু জায়গায় মাছ ও ধান চাষ করে এখন আর সংসার চলছে না। তাই যশোরে ইট ভাটায় কাজ করে ছয় মাস আর বাকি ছয় মাস ক্ষেতে কাজ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে।

স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হন এলাকা ত্যাগ করার। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন খুলনা বা ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশা চালাতে, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নিম্নবেতনের শ্রমিকে পরিণত হতে। খুলনা, ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ শ্যামনগর, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে। সহায় সম্পদ হারিয়ে তারা শহরমুখি হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে

Update Time : ০৫:৪০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা)

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘন ঘন দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রথাগত জীবন-জীবিকা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। কৃষি ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার উপায় ও পেশায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব-দ্বীপপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ দেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন-ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা, নদী ভাঙন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এ দেশে প্রতিনিয়তই দৃশ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তন স্পষ্টতই মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তনশীল জলবায়ুর এই চক্র উপকূলে বসবাসরত সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে উপকূলে, যাদের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র উপাদান হচ্ছে কৃষি। বর্তমানে কৃষি থেকে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় তা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বিশেষত ২০৫০ সালের মধ্যে যে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে, সেটা ৮ শতাংশ এবং গম উৎপাদন কমবে ৩২ শতাংশ। যার প্রভাব পড়বে উপকূলের মানুষের জীবন জীবিকার উপর।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। আর দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও প্রকৃতি জলবায়ু ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আছে। সিডর, আইলা এবং অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চিংড়ি খামারসহ মৎস্য শিল্প এবং ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ফলস্বরূপ খামার এবং মাছ ধরার নৌকাগুলোতে দৈনিক শ্রমের সুযোগ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। কয়রা, পাইকগাছা, শ্যামনগর, আশাশুনি এলাকার লোকেরা কাজ, বিকল্প আয় এবং ইট প্রস্তুতকারক, রিকশাচালক এবং শ্রমিক হিসেবে কর্মসংস্থানের জন্য অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীর বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান গাজী জানান, মাছের ঘেরে ও কৃষি কাজ করে সংসার চলছে না তাই খুলনা শহরে রিকশা চালিয়ে সংসারে খরচ বহন করছি।

উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় যেসব বড় পরিবর্তন আসছে। লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে লবণ-সহিষ্ণু জাতের ধান, তরমুজ বা শাকসবজি চাষে ঝুঁকছেন। মাছ শিকারিরা গভীর সমুদ্রে দুর্যোগের ঝুঁকি ও মাছের আকাল দেখে কাঁকড়া চাষ বা দিনমজুরিতে পেশা পরিবর্তন করছেন। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে মিষ্টি পানির পুকুর বা ঘেরে মাছ চাষ কঠিন হয়ে পড়েছে। এর বিকল্প হিসেবে উপকূলের অনেক এলাকায় এখন কুঁচে মাছ ও কাঁকড়া চাষের প্রসার ঘটেছে।

দুর্যোগে পুরুষরা কর্মহীন হয়ে পড়লে নারীরা বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন ও কাঁকড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তেমনি পেশাও বদলে যাচ্ছে। পাইকগাছার গোপালপুর গ্রামের করিম গাজী বলেন, অল্প একটু জায়গায় মাছ ও ধান চাষ করে এখন আর সংসার চলছে না। তাই যশোরে ইট ভাটায় কাজ করে ছয় মাস আর বাকি ছয় মাস ক্ষেতে কাজ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে।

স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হন এলাকা ত্যাগ করার। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন খুলনা বা ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশা চালাতে, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নিম্নবেতনের শ্রমিকে পরিণত হতে। খুলনা, ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ শ্যামনগর, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে। সহায় সম্পদ হারিয়ে তারা শহরমুখি হচ্ছে।