০৪:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০২৬-২৭ : বাজেট

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির রূপরেখা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • ১৫ Time View

সবুজদিন রিপোর্ট।।

স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ দেড় বছর দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে এসেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্বেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সরকারপ্রধান হয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতীক্ষার পর ক্ষমতায় এসে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দলটি। আর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংক খাত, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই সরকারকে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রায় চার মাসের মাথায় এটি তাদের প্রথম বাজেট। এই বাস্তবতায় গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ।’

বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়নের ভিত্তিতেই একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নির্মাণ করার কথা বলেছেন। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা দেশে তৈরি হয়েছে, সেটিকে ধারণ করে এই বাজেট প্রস্তাব করেছেন তারা। সে কারণে সামাজিক নিরাপত্তা আওতা বাড়ানোসহ নতুন অনেক বিষয় এসেছে। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দীর্ঘদিন দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে গতিশীল করা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়।

প্রস্তাবিত এ বাজেট আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম এবং দেশের ৫৫তম বাজেট। সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা গতবারের থেকে ২৫ হাজার বৃদ্ধি পেয়ে পৌনে চার লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের কর কাঠামো নয়, করদাতারা যাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের একটি ধারাবাহিক রূপরেখাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ব্যাংকে রাখা টাকার ওপর আবগারি শুল্ক বসানোর সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হচ্ছে। তবে ঋণের টাকার ক্ষেত্রে একবার আবগারি শুল্ক আরোপ হবে। তবে বাজেটের আকার যত বড়, তা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও ততটাই গভীর বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রফতানিমুখী শিল্প, কৃষি এবং উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বাজেটে একদিকে যেমন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনকে আরো কঠোর করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। তবে নি¤œ আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা প্রদানকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই বাজেটটি মূলত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি নি¤œ আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিয়েছে। আর এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে করের বাইরে থাকা বিভিন্ন খাত করের আওতায় আনা, কর পরিপালন বাড়ানো এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে এর আগে বাজেট ঘোষণার কয়েক দিন আগে থেকেই বাজারে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়া হতো। এ বছর বাজারে কোথাও দাম বাড়ার গুঞ্জন, আতঙ্ক ছড়ানো বা বাজেটকে কেন্দ্র করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো লক্ষণ নেই। মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকটে যখন বিপর্যস্ত অর্থনীতি, সেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জনতুষ্টির বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং কাজের সুযোগ বা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে। এই চিন্তা থেকে বড় সুবিধা দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের এই প্রথম বাজেটে কর ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। করের আওতা বাড়ানোর বাড়ানোর ভিত্তি কি হবে, এ নিয়ে লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর কাঠামোর পরিকল্পনাতেই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে সুবিধা এবং এক ধরনের নিশ্চয়তা দেয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, নি¤œ আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবারে প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এ বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, যার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য ৪০ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবনার তথ্য মতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবনায়, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট তিন লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় তিন লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ছয় লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট দুই লাখ ৭৯ হাজার এক কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিফলন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্বাহ করা হবে। চলতি ২০২৩-২৬ অর্থবছরে যা ছিল এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎÑ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের লক্ষ্য প্রায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা। কিন্তু চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নতুন অর্থবছরে এত বড় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যকে অনেক বিশেষজ্ঞই অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন। রাজস্ব বিশ্লেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের ওপর জোর দিতে হবে। আর প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘চিন্তাশীল বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি মনে করেন, বাজেটের নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল।

ট্রিলিয়ন ডলার ‘থ্রি-আর’ কৌশল : অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সরকার ‘থ্রি-আর’ কৌশল উন্মোচন করতে যাচ্ছে। গতকাল বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই থ্রি-আর কৌশল ঘোষণা করেন। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন। সরকার তিন ধাপে এই কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম ধাপ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এটি এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। দ্বিতীয় ধাপ-অর্থনীতির উত্তরণ, যা বর্তমান সরকারের এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ-সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণ। পাঁচ বছর ধরে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গতি ফিরে পেয়েছে এবং ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

সৃজনশীল অর্থনীতির রূপরেখা : এবারের বাজেটের অন্যতম নতুন দিক হলো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করা। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

বাজেটে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন প্রজন্মকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অবশ্য বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি ছাড়া বিনিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো নতুন ধারণা রয়েছে। এগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

জনগণের জন্য স্বস্তির বার্তা : উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য কিছু স্বস্তির উদ্যোগও থাকছে বাজেটে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, গোশত, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় বড় বরাদ্দ : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, ‘হেলথ কার্ড’ এবং ‘প্রবাস কার্ড’ কর্মসূচি।

উন্নয়ন ব্যয়ে রেকর্ড পরিকল্পনা : বাজেটে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি ব্যয় আরো বাড়বে, যা রাজস্ব সংগ্রহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

ভর্তুকি ও প্রণোদনা : বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থির থাকায় সরকার জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ এক লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অগ্রাধিকার : প্রস্তাবিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

দেশীয় শিল্পে করছাড় : ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় আরো ৯টি পণ্য যুক্ত করা হতে পারে। এছাড়া অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। দেশে ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যোগাযোগে বিপ্লবের ইঙ্গিত : দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে চার লেনে উন্নীত করা এবং একটি ‘মাল্টিমোডাল হাব’ গড়ে তোলার কাজ চলছে। এছাড়াও প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড তৈরির জন্য সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী সাত বছরে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক চিন্তার বাজেট : সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট বিএনপি সরকারের জন্য শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এই বাজেটে প্রধান্য পেয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, রাজনৈতিক সরকার তাদের রাজনৈতিক চিন্তা থেকে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এই বাজেট দেয়ার কথা বলছে। এখন দেশের ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতি স্বাভাবিক করে এর বাস্তবায়ন আসলেই বড় চ্যালেঞ্জ।

অবশ্য এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার আকারে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। কারণ বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন যাত্রার দিকনির্দেশনা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

২০২৬-২৭ : বাজেট

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির রূপরেখা

Update Time : ০১:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সবুজদিন রিপোর্ট।।

স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ দেড় বছর দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে এসেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্বেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সরকারপ্রধান হয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতীক্ষার পর ক্ষমতায় এসে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দলটি। আর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংক খাত, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই সরকারকে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রায় চার মাসের মাথায় এটি তাদের প্রথম বাজেট। এই বাস্তবতায় গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ।’

বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়নের ভিত্তিতেই একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নির্মাণ করার কথা বলেছেন। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা দেশে তৈরি হয়েছে, সেটিকে ধারণ করে এই বাজেট প্রস্তাব করেছেন তারা। সে কারণে সামাজিক নিরাপত্তা আওতা বাড়ানোসহ নতুন অনেক বিষয় এসেছে। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দীর্ঘদিন দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে গতিশীল করা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়।

প্রস্তাবিত এ বাজেট আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম এবং দেশের ৫৫তম বাজেট। সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা গতবারের থেকে ২৫ হাজার বৃদ্ধি পেয়ে পৌনে চার লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের কর কাঠামো নয়, করদাতারা যাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের একটি ধারাবাহিক রূপরেখাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ব্যাংকে রাখা টাকার ওপর আবগারি শুল্ক বসানোর সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হচ্ছে। তবে ঋণের টাকার ক্ষেত্রে একবার আবগারি শুল্ক আরোপ হবে। তবে বাজেটের আকার যত বড়, তা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও ততটাই গভীর বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রফতানিমুখী শিল্প, কৃষি এবং উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বাজেটে একদিকে যেমন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনকে আরো কঠোর করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। তবে নি¤œ আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা প্রদানকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই বাজেটটি মূলত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি নি¤œ আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিয়েছে। আর এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে করের বাইরে থাকা বিভিন্ন খাত করের আওতায় আনা, কর পরিপালন বাড়ানো এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে এর আগে বাজেট ঘোষণার কয়েক দিন আগে থেকেই বাজারে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়া হতো। এ বছর বাজারে কোথাও দাম বাড়ার গুঞ্জন, আতঙ্ক ছড়ানো বা বাজেটকে কেন্দ্র করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো লক্ষণ নেই। মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকটে যখন বিপর্যস্ত অর্থনীতি, সেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জনতুষ্টির বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং কাজের সুযোগ বা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে। এই চিন্তা থেকে বড় সুবিধা দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের এই প্রথম বাজেটে কর ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। করের আওতা বাড়ানোর বাড়ানোর ভিত্তি কি হবে, এ নিয়ে লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর কাঠামোর পরিকল্পনাতেই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে সুবিধা এবং এক ধরনের নিশ্চয়তা দেয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, নি¤œ আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবারে প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এ বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, যার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য ৪০ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবনার তথ্য মতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবনায়, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট তিন লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় তিন লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ছয় লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট দুই লাখ ৭৯ হাজার এক কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিফলন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্বাহ করা হবে। চলতি ২০২৩-২৬ অর্থবছরে যা ছিল এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎÑ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের লক্ষ্য প্রায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা। কিন্তু চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নতুন অর্থবছরে এত বড় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যকে অনেক বিশেষজ্ঞই অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন। রাজস্ব বিশ্লেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের ওপর জোর দিতে হবে। আর প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘চিন্তাশীল বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি মনে করেন, বাজেটের নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল।

ট্রিলিয়ন ডলার ‘থ্রি-আর’ কৌশল : অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সরকার ‘থ্রি-আর’ কৌশল উন্মোচন করতে যাচ্ছে। গতকাল বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই থ্রি-আর কৌশল ঘোষণা করেন। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন। সরকার তিন ধাপে এই কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম ধাপ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এটি এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। দ্বিতীয় ধাপ-অর্থনীতির উত্তরণ, যা বর্তমান সরকারের এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ-সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণ। পাঁচ বছর ধরে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গতি ফিরে পেয়েছে এবং ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

সৃজনশীল অর্থনীতির রূপরেখা : এবারের বাজেটের অন্যতম নতুন দিক হলো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করা। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

বাজেটে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন প্রজন্মকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অবশ্য বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি ছাড়া বিনিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো নতুন ধারণা রয়েছে। এগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

জনগণের জন্য স্বস্তির বার্তা : উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য কিছু স্বস্তির উদ্যোগও থাকছে বাজেটে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, গোশত, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় বড় বরাদ্দ : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, ‘হেলথ কার্ড’ এবং ‘প্রবাস কার্ড’ কর্মসূচি।

উন্নয়ন ব্যয়ে রেকর্ড পরিকল্পনা : বাজেটে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি ব্যয় আরো বাড়বে, যা রাজস্ব সংগ্রহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

ভর্তুকি ও প্রণোদনা : বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থির থাকায় সরকার জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ এক লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অগ্রাধিকার : প্রস্তাবিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

দেশীয় শিল্পে করছাড় : ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় আরো ৯টি পণ্য যুক্ত করা হতে পারে। এছাড়া অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। দেশে ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যোগাযোগে বিপ্লবের ইঙ্গিত : দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে চার লেনে উন্নীত করা এবং একটি ‘মাল্টিমোডাল হাব’ গড়ে তোলার কাজ চলছে। এছাড়াও প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড তৈরির জন্য সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী সাত বছরে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক চিন্তার বাজেট : সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট বিএনপি সরকারের জন্য শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এই বাজেটে প্রধান্য পেয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, রাজনৈতিক সরকার তাদের রাজনৈতিক চিন্তা থেকে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এই বাজেট দেয়ার কথা বলছে। এখন দেশের ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতি স্বাভাবিক করে এর বাস্তবায়ন আসলেই বড় চ্যালেঞ্জ।

অবশ্য এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার আকারে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। কারণ বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন যাত্রার দিকনির্দেশনা।