১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন চ্যালেঞ্জের মুখে ব্যাংক

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:০৯:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৪৫ Time View

অনলাইন ডেস্ক

সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতিসহ দেশের দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। কিন্তু অর্থনীতির ধমনি হিসেবে বিবেচিত ব্যাংক খাতের অবস্থা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার ও বিশৃঙ্খল ব্যাংক খাত আড়চোখে তাকাচ্ছে সরকারের দিকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় ও অর্থপাচার বন্ধ করে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণের ফলে খাতটি চাপে পড়েছে। এখন টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের ক্ষত চিহ্নিত করার জন্য নতুন করে কমিটি (টাস্কফোর্স) গঠন করা উচিত। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করতে হবে বলে মনে করেন এই ব্যাংকার। কারণ নামে-বেনামে যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণের ফলে যে পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়েছে, বিশেষ কোনো উদ্যোগ না নিলে বা শক্ত হাতে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ব্যাংকিং খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-ভিত্তিক তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা; যার ৩৫.৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাত ছিল অন্যতম ভুক্তভোগী। সুশাসনের অভাব এতটাই যে, স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছরে এ দেশের ব্যাংকিং খাত এত বেশি সমস্যার মুখোমুখি আর কখনো হয়নি।
তাই অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা এলে আর ভুয়া ঋণ বিতরণ হবে না। হুন্ডি বন্ধ হবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়বে। ব্যাংকে সুশাসন ফিরলে খেলাপি ঋণও কমবে। এটা ব্যাংক খাতের ক্যান্সারের মতো। খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সরকারকে মূল্যস্ফীতি হ্রাস করতে এবং রাজস্ব বাড়াতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, সুশাসন ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ছয়টি ব্যাংক মার্জ করা হয়েছে। সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি ব্যাংক খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য মতে, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। পণ্য সরবরাহ চ্যানেল নিয়ন্ত্রণও জরুরি। তারপরও হুন্ডি কমিয়ে আনতে সফল হয়েছে বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে রেমিট্যান্স বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার সময় দেশের রিজার্ভ বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য মতে, দেশে গত ১৫ বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র’ তৈরি হয়েছিল। যাতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, হুন্ডি বন্ধ ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত দেড় বছর খুবই ভালো কাজ করেছে। ফলে গত দেড় বছর বৈদেশিক মুদ্রার দর তেমন বাড়েনি। আবার কমেওনি। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো প্রবাসী প্রধান দেশগুলোতে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে অনেক বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। ফলে এই রেমিট্যান্স রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করেছে। নতুন সরকারের উচিত হবে হুন্ডি বন্ধে জিরো টলারেন্স ও ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি ঘোষণা করা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন চ্যালেঞ্জের মুখে ব্যাংক

Update Time : ০২:০৯:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক

সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতিসহ দেশের দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। কিন্তু অর্থনীতির ধমনি হিসেবে বিবেচিত ব্যাংক খাতের অবস্থা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার ও বিশৃঙ্খল ব্যাংক খাত আড়চোখে তাকাচ্ছে সরকারের দিকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় ও অর্থপাচার বন্ধ করে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণের ফলে খাতটি চাপে পড়েছে। এখন টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের ক্ষত চিহ্নিত করার জন্য নতুন করে কমিটি (টাস্কফোর্স) গঠন করা উচিত। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করতে হবে বলে মনে করেন এই ব্যাংকার। কারণ নামে-বেনামে যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণের ফলে যে পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়েছে, বিশেষ কোনো উদ্যোগ না নিলে বা শক্ত হাতে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ব্যাংকিং খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-ভিত্তিক তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা; যার ৩৫.৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাত ছিল অন্যতম ভুক্তভোগী। সুশাসনের অভাব এতটাই যে, স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছরে এ দেশের ব্যাংকিং খাত এত বেশি সমস্যার মুখোমুখি আর কখনো হয়নি।
তাই অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা এলে আর ভুয়া ঋণ বিতরণ হবে না। হুন্ডি বন্ধ হবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়বে। ব্যাংকে সুশাসন ফিরলে খেলাপি ঋণও কমবে। এটা ব্যাংক খাতের ক্যান্সারের মতো। খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সরকারকে মূল্যস্ফীতি হ্রাস করতে এবং রাজস্ব বাড়াতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, সুশাসন ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ছয়টি ব্যাংক মার্জ করা হয়েছে। সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি ব্যাংক খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য মতে, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। পণ্য সরবরাহ চ্যানেল নিয়ন্ত্রণও জরুরি। তারপরও হুন্ডি কমিয়ে আনতে সফল হয়েছে বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে রেমিট্যান্স বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার সময় দেশের রিজার্ভ বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য মতে, দেশে গত ১৫ বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র’ তৈরি হয়েছিল। যাতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, হুন্ডি বন্ধ ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত দেড় বছর খুবই ভালো কাজ করেছে। ফলে গত দেড় বছর বৈদেশিক মুদ্রার দর তেমন বাড়েনি। আবার কমেওনি। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো প্রবাসী প্রধান দেশগুলোতে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে অনেক বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। ফলে এই রেমিট্যান্স রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করেছে। নতুন সরকারের উচিত হবে হুন্ডি বন্ধে জিরো টলারেন্স ও ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি ঘোষণা করা।