সবুজদিন রিপোর্ট।।
পিরোজপুরে পুলিশ মেসের কেয়ারটেকারকে চুরির মিথ্যা অভিযোগে নৃশংসভাবে নির্যাতনের ঘটনায় জেলার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি আরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন ও মো. কায়সার এই তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই তিন ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে ওই কেয়ারটেকারের পুরুষাঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনা জানাজানির পর তা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।
এদিকে, ঘটনার তিন দিন পর শুক্রবার দুপুরে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে নিজ উদ্যোগে ভর্তি হয়েছেন ভুক্তভোগী ইউনুস।
চিকিৎসাধীন ইউনুস ফকিরের ওপর যে দৈহিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা অত্যন্ত নৃশংস ও অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন।
এ ঘটনার বিষয়ে পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাটি তদন্তে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ ব্যাপারে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বর্তমানে ছুটিতে আছেন। ছুটি থেকে ফিরে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল জানান, ঘটনাটি পুলিশের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে সার্বিক ঘটনার বিচার করা হবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশের বিকল্প হিসেবে ডিবি পুলিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এর আগে পিরোজপুর পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসের কেয়ারটেকার মো. ইউনুস ফকির (৪০) গত ১৩ এপ্রিল (সোমবার) ডিবি পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। ডিবি পুলিশের ওসি আরিফুল ইসলামের কক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে—এ অভিযোগে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তবে পরবর্তীতে পুলিশ মেসের পরিচ্ছন্নতা কর্মী শাকিল খানের কাছ থেকে চুরি যাওয়া সমুদয় টাকা উদ্ধার হয়।
নির্যাতনের শিকার ইউনুস জানান, তিনি ২০১৮ সাল থেকে পিরোজপুর শহরতলীর ঝাটকাঠি এলাকায় অবস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসের চারতলা ভবনের কেয়ারটেকারের দায়িত্বে আছেন। গত সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে ওসি আরিফুল বলেন, তার কক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুসই সেই টাকা নিয়েছেন। এ সময় টাকা চুরির কথা অস্বীকার করায় তাকে ওসি আরিফুল হাতকড়া পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে যান এবং এলোপাতাড়িভাবে মারধর করেন।
পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের আরও ৭–৮ জন সদস্য সেখানে গিয়ে ইউনুসকে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে এবং বৈদ্যুতিক শক দেয়। ইউনুস আরও জানান, তার দুই পায়ের পাতার নিচে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও ফোলা জখম করা হয়। এ সময় তিনি চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি দিয়ে শব্দ বন্ধ করে রাখে ডিবি পুলিশের সদস্যরা।
একপর্যায়ে ডিবি পুলিশ সদস্য কাওসারের নেতৃত্বে ৩–৪ জন জোর করে ইউনুসকে রান্নাঘরে নিয়ে যায়। সেখানে তারা ইউনুসের পুরুষাঙ্গে আগুনে মোমবাতি গলিয়ে তপ্ত মোম ফেলে নির্যাতন চালায়।
পরে ডিবি পুলিশের লোকজন ইউনুসকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা নির্যাতনের ভয়ে স্থানীয়ভাবে সুদে টাকা এনে ডিবি পুলিশকে দেয়।
এদিকে, এ ঘটনার পর ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপারের কাছে নিয়ে যান ডিবি ওসি আরিফুল ইসলাম। তখন পুলিশ সুপার ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসে কাজ করা পরিচ্ছন্নতা কর্মী (ঝাড়ুদার) শাকিল খানকে ডেকে পাঠান। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। পরে ইউনুসের দেওয়া টাকা আরিফুল ফেরত দেন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না, যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তাই তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। ইউনুসের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে, তার বিচার চাই।
Reporter Name 




















