বিশেষ প্রতিনিধি
অপরিমেয় প্রত্যাশার ভার নিয়ে জনতার মহাসমুদ্রে রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটেছে রাজনীতির রাজপুত্র বাংলাদেশের জননন্দিত নেতা তারেক রহমানের। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর ৮ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে এসে তিনি নিজের দেশের মাটি স্পর্শ করলেন। আপ্লুত হয়ে হাতে তুলে নিলেন মাতৃভূমির এক মুঠো মাটি। ১৭ বছর আগে বাধ্য করা হয়েছিল তাঁকে প্রিয় মাতৃভূমি ছাড়তে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটিবার দেখা, আর তাঁর মুখের একটু কথা শোনার জন্য লাখ লাখ মানুষ তীব্র কনকনে শীত উপেক্ষা করে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে বসেছিল।
কখন আসবে প্রাণপ্রিয় নেতা তারেক রহমান। অতঃপর ১৭ বছরের শত সংগ্রাম শেষে পিতা স্বাধীনতার ঘোষক জিয়ার মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন নেতা। ছুটে গেলেন বসুন্ধরা স্মার্ট সিটির পাশে গড়ে তোলা সংবর্ধনা মঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে।
উপস্থিত জনতা তাঁকে অভিনন্দন ও স্বাগত জানাল। তিনিও দুই হাত উঁচিয়ে বারবার উষ্ণ অভিবাদন জানালেন অপেক্ষমাণ জনতাকে। পাল্টাপাল্টি এই অভিনন্দন আর অভিবাদনে ভরে গেল রাজধানীর পূর্বাচল রুটের ৩০০ ফিট সড়কের হৃদয়সমেত মাঠ। এ সময় সমাবেশস্থলে নেতা-কর্মীদের মাঝে মহামিলনের অপূর্ব মোহনায় একত্র হওয়ার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়।
লাখো জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। মঞ্চে জনতার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংবর্ধনা মঞ্চে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতা ছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গেও করমর্দন ও কুশলাদি বিনিময় করেন বিএনপির কান্ডারি তারেক রহমান।
বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে গণসংবর্ধনাস্থলের মঞ্চে উঠে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ চেয়ার সরিয়ে রেখে সাধারণ একটি চেয়ার টেনে সেটায় বসেছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। জননন্দিত নেতা তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বিকালেই চার পাতার বর্ণাঢ্য বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
১১টা ৪০ মিনিটে বিমান নামল ঢাকায়
বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে দেশনেতা তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ফ্লাইট নং-২০২০) বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজটি সিলেট হয়ে এসে রাজধানীর হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ সিনিয়র নেতারা তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। দীর্ঘদিন পর দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন তাঁরা। বিমানবন্দরে পরিবারসহ তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ দলের সিনিয়র নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমদ, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. আবদুল মঈন খান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সিনিয়র নেতাকেও দেখা যায়। এরপর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বসেই তারেক রহমান টেলিফোনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। সার্বিক সহযোগিতার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তারেক রহমান। এরপর ডা. জুবাইদা রহমান ও ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বিমানবন্দর থেকে গুলশানের নতুন বাসায় চলে যান। এর আগে বুধবার মধ্যরাতে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি গতকাল সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে যাত্রাবিরতি শেষে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে।
হাতে-পায়ে স্পর্শ করলেন প্রিয় দেশের মাটি : দেশে ফিরে বিমানবন্দরেই খালি পায়ে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ভিআইপি গেট দিয়ে বের হয়ে পূর্বনির্ধারিত ‘লাল-সবুজ রঙের’ বাসে ওঠার আগে তিনি বিমানবন্দরসংলগ্ন বাগানে যান। সেখানে শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেশের মাটি স্পর্শ করেন তারেক। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নেন। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বিমানবন্দর টু ৩০০ ফিট লোকে লোকারণ্য : তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে সভাস্থল রাজধানীর ৩০০ ফিট পর্যন্ত ছিল লোকে লোকারণ্য। লাল-সবুজের বাসটি বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সড়কের সমাবেশস্থলে যাওয়ার পথে সড়কের দুই পাশে লাইন ধরে প্রিয় নেতাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তিনি সহাস্যে হাত নেড়ে সবার অভিবাদনের জবাব দেন। এ সময় হাজার হাজার নেতা-কর্মীর উৎসবমুখর উপস্থিতি দেখা গেছে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। অনেকে সড়কে জায়গা না পেয়ে বাসের ছাদে উঠে তারেক রহমানকে দেখার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রিকশা ভাড়া করে এনে সেটির ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে দেখে আনন্দে ফেটে পড়েন। তারেক রহমান বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। বাসটি যতই ৩০০ ফিট সড়কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, বিমানবন্দর সড়কে থাকা জনতা ও নেতা-কর্মীদের স্রোত প্রবাহিত হয় বাসের দিকে। কেউ নিজের ফোনে প্রিয় নেতার ছবি তুলে প্রাণ জুড়িয়েছেন, আবার কেউ তারেক রহমানকে একঝলক দেখে উল্লাসে মেতেছেন। যেন এই দিনটির জন্যই বছরের পর বছর অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।
সড়কে দাঁড়ানো বিএনপি কর্মী মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের জেল-জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতনে দীর্ঘ ১৭ বছর ঘরে ঘুমাতে পারিনি। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকেও নির্যাতন করা হয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের খুন-গুম করা হয়েছে। এসব দুঃসময় কাটানোর পর আজ আমাদের সর্বোচ্চ আনন্দের দিন। আমাদের নেতা, তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন। তার হাত ধরেই গড়ে উঠবে দুর্নীতিমুক্ত সবার প্রত্যাশার বাংলাদেশ। ’ আরেক কর্মী আবদুল মান্নান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রাণ দেশে ফিরেছে। আমাদের সবারই আজ খুব ভালো লাগছে। ’ তারেক রহমানকে একনজর দেখার আশায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে বিমানবন্দর সড়কে আসেন জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বুধবার রাত ১০টায় হাটহাজারী থেকে রওনা দিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় পূর্বাচলে পৌঁছেন। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বিমানবন্দরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার আশায়। তাঁকে দেখতে পেয়ে কষ্ট সার্থক মনে হয়েছে তাঁরা।
এর আগে বুধবার ভোর রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে জনতার ঢল নামতে শুরু করে এ সড়কে। অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তারেক রহমানকে একনজর দেখার আশায় সড়কের পাশে অবস্থান করেন। প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘মা মাটি ডাকছে, তারেক রহমান আসছে’ এবং ‘তারেক রহমান বীরের বেশে, আসছে ফিরে বাংলাদেশ’-এর মতো নানা আবেগঘন স্লোগান। এ সময় নেতা-কর্মীদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার দেখা যায়। আমাদের নেতা আমাদের বুকে ফিরে এসেছে, ‘তারেক রহমান ফিরল দেশে, গড়ব দেশ মিলেমিশে’, ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’, ‘দেশে ফেরায় সংগ্রামী শুভেচ্ছা’, ‘প্রত্যাবর্তন-২৫’, ‘হিরোইক রিটার্ন অব তারেক রহমান’, ‘দেশের টানে জনতার প্রাণ’, ‘স্বাগতম তারেক রহমান’, ‘তারেক রহমান আসছে দেশে ভোট দেবেন ধানের শীষে’ ‘গণতন্ত্রের অপর নাম তারেক রহমান’ এমন বিভিন্ন ব্যানার টাঙানো হয় সড়কের দুই পাশে।
নজিরবিহীন নি-িদ্র নিরাপত্তা : বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে কড়া নিরাপত্তায় বুলেট প্রুফ বাসে করে সমাবেশস্থলে যান তারেক রহমান। সমাবেশস্থলসহ ৩০০ ফিট সড়ক ও বিমানবন্দরের দুই পাশের পুরো সড়কজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীসহ বিপুলসংখ্যক বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন ও আনসার সদস্য। সাদাপোশাকে দায়িত্ব পালন করেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকরা হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে দলীয় কর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থানের আহ্বান জানান। এ ছাড়া কিছুক্ষণ পরপর সড়কের পাশে চোখে পড়ে জরুরি মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স।
সৃষ্ট সব বর্জ্য অপসারণ : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে অভূতপূর্ব জনসমাবেশে রাজধানীর জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফিট মহাসড়ক), এয়ারপোর্ট রোড ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট সব বর্জ্য ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি স্বেচ্ছাশ্রমে আজ (শুক্রবার) সকাল থেকে অপসারণ কার্যক্রম শুরু করবে। বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক প্রফেসর ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ভোর থেকে মিছিলের নগরী ঢাকা : দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে রাজধানীর সব সড়কের জনস্রোত এসে মিলেছিল বসুন্ধরা স্মার্ট সিটির পাশের ৩০০ ফিটে। গতকাল ভোরেই শুরু হয় মানুষের এ মিছিল। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে রাজনীতির এই বরপুত্রকে বরণে রাজধানীর অলিগলিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে পৌঁছে যান সংবর্ধনাস্থলে। এসময় নানা স্লোগানে মুখরিত ছিল সকালের সব রাজপথ। দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারিকে একনজর দেখতে দলের নেতা-কর্মী ছাড়াও ‘আবালবৃদ্ধবনিতা’র ঢল নেমেছিল রাজপথে। কনকনে শীত উপেক্ষা করে দীর্ঘপথ হেঁটে বানের স্রোতের মতো সবাই ছুটেছেন ৩০০ ফিটের দিকে। প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে আসা মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও পানি বিতরণ করতে দেখা যায় দলের নেতা-কর্মীদের।
সরেজমিন রাজধানীর মহাখালী, গুলশান, নতুন বাজার, উত্তরা, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্পট থেকে দেখা গেছে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, মহিলা দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ছুটছেন সংবর্ধনাস্থল ৩০০ ফিটের দিকে। তাদের কণ্ঠে কণ্ঠে ‘তারেক রহমান এগিয়ে চলো, বাংলাদেশ তোমার সাথে’; ‘তারেক রহমান আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘লিডার আসছে’ রাজপথ কাঁপছে’ ইত্যাদি স্লোগান। পাশাপাশি দেখা যায় কণ্ঠে স্লোগান না থাকলেও হাজারো মানুষ হেঁটে ৩০০ ফিটে ছুটছেন। বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যারিকেড দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় দীর্ঘপথ হেঁটেই সমাবেশে যোগ দিতে যান তারা। গতকাল কনকনে শীতের সকালে আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর সড়কগুলোতে নামে নানা বয়সি মানুষের ঢল।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে গতকাল তৈরি হয় রাজধানীজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢোল-বাদ্য বাজিয়ে অনেক নেতা-কর্মীকে সমাবেশে যেতে দেখা যায়। অনেকের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কারও কারও বুকে লাগানো ছিল দলের বা নেতার ছবিসংবলিত ব্যাজ। ভ্যানে চড়ে ধানের শীষ হাতে কিষান-কিষানি। আবার এক রঙের টি-শার্ট বা ক্যাপ লাগিয়ে সমাবেশে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতা-কর্মীরা। দলীয় নেতা-কর্মীদের বাইরেও অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে পৌঁছান সংবর্ধনাস্থলে। খুলনা থেকে আসা বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্র্মী জানালেন, রাতে হোটেলে ছিলেন। সকাল সকাল সংবর্ধনাস্থলে যাত্রা করেছেন। যাতে নেতাকে একনজর দেখা যায়। চাঁদপুর থেকে আসা যুবদলের এক নেতা বলেন, দীর্ঘদিন পরবাসে থাকা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানাতে এসেছেন ঢাকায়। দেশে আসার খবরে সাধারণ জনগণসহ বিএনপির সর্বস্তরের জনগণ উচ্ছ্বসিত।
সকাল ৮টা থেকে রাজধানীর মহাখালীর আমতলী থেকে এয়ারপোর্টগামী সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইভাবে গুলশান নতুন বাজার থেকে কুড়িল সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তরা থেকে এয়ারপোর্টগামী সড়কটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ রাস্তায় হেঁটেই বানের স্রোতের মতো মানুষের ঢল ছিল ৩০০ ফিটমুখী। সারা দেশ থেকে ভোরেই অনেক বাস পৌঁছে যায় ৩০০ ফিটের পশ্চিমে কুড়িল ও পূর্বপ্রান্তে কাঁচপুরে। অনেকেই আবার দু-একদিন আগেই চলে আসেন ঢাকায়।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকাও ছিল লোকে লোকারণ্য। বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী, অন্যদিকে বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত সড়ক ছিল জনাকীর্ণ। বিমানবন্দরে গড়ে তোলা হয়েছে নি-িদ্র নিরাপত্তা। ভিভিআইপি টার্মিনালের প্রধান ফটক কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা ছিল। উত্তরার জসিমউদ্দীন এলাকায় মানবঢাল করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীরাও সহযোগিতা করেন যেন তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে বাধাহীনভাবে ৩০০ ফিটে পৌঁছাতে পারেন। সেজন্য সড়ক খালি করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুরোধ করা হলেও মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল নেতার গাড়িটি একনজর দেখার জন্য।
তারেক রহমানের গণসংবর্ধনাস্থলে আসতে সড়ক পথের পাশাপাশি রেলপথেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বিভিন্ন স্থান থেকে স্পেশাল ট্রেন চলাচল করে এদিন। পাশাপাশি নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হয়। খুলনা ও যশোর থেকে রেলপথে আসা মানুষ কমলাপুর রেলস্টেশনে এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ রেলপথের যাত্রীদের এয়ারপোর্ট স্টেশন হয়ে সমাবেশে যোগ দিতে দেখা যায়। অধিকাংশ ট্রেনের যাত্রীই এয়ারপোর্ট স্টেশনে নেমে হাঁটা শুরু করেন। অনেকে কমলাপুর স্টেশনে এসে নেমে যাত্রা করেন। কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, তারেক রহমানের অভ্যর্থনায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে যারা আসছেন, তারা বিমানবন্দর স্টেশনেই নামছেন বেশি। শুধু দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যশোর ও খুলনার কয়েকটি ট্রেনের চাপ কমলাপুরে আছে। নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ১০টি রুটে ২০টি স্পেশাল ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে।
নেতা-কর্মীদের শুকনো খাবার ও পানি বিতরণ : সময় তখন বুধবার দিবাগত রাত ৩টা। কনকনে শীত উপেক্ষা করে লোকে-লোকারণ্য হয়ে উঠেছে বসুন্ধরা স্মার্ট সিটির পাশের ৩০০ ফিট বা জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে মহাসড়ক। কোথাও চলছে স্লোগান, কোথাও নাচগান, কেউ আইল্যান্ডে বসে সারছে রাতের খাবার। কেউ তুলছে সেলফি, কেউ মোবাইলে করছে লাইভ ভিডিও। রাস্তার পাশে দলবেঁধে চায়ের আড্ডায় ব্যস্ত অনেকে। কিছুক্ষণ পর পর রং-বেরঙের পোশাক-টুপি পরে মিছিল নিয়ে আসছে মানুষ। ঘুম নেই কারও চোখে। রাত যত বাড়ছিল, ততই যেন জেগে উঠছিল সড়কটি। গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে বুধবার দিবাগত রাতেই এমন সরগরম হয়ে ওঠে সড়কটি।
প্রিয় নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আনন্দে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- সারা দেশের সব পথ যেন ৩০০ ফিট সড়কের এক বিন্দুতে মিলিত হয়। শীত উপেক্ষা করে বাসের পাশাপাশি বুধবার রাতভর খোলা ট্রাকেও দূরদূরান্ত থেকে আসতে দেখা গেছে বিএনপি নেতা-কর্মীদের। যানবাহন না পাওয়ায় বুধবার গভীর রাতে আশপাশের অনেকে নীলা মার্কেট পর্যন্ত রাস্তায় জনসমাগম বাড়ায় গতকাল দুপুরের পর সব বাসকে জলসিঁড়ি এলাকায় দাঁড়াতে হয়। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার হেঁটে গান গাইতে গাইতে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে দেখা যায়। নেতাকে কাছ থেকে দেখতে মঞ্চের আশপাশেই অবস্থান নেন আগে আসা নেতা-কর্মীরা। জায়গা হারানোর ভয়ে সড়কেই পলিথিন বিছিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে রাত পার করে দেন অনেকে। তারেক রহমানকে বরণ করতে এক বছরের শিশুকে কোলে নিয়েও হাজির হন অনেক মা। মঞ্চের সামনের দিকে সড়কটির সার্ভিস রোডে হারমোনিয়াম, ঢোল-তবলা নিয়ে বসে যান কক্সবাজার থেকে আসা নেতা-কর্মীরা। বাদ্যের তালে রাতভর চলে নাচগান। অনেকেই সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। দলের পক্ষ থেকে নেতা-কর্মীদের মধ্যে শুকনো খাবার ও পানি বিতরণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া এলাকাভেদে দলীয় নেতারা তাদের কর্মীদের জন্য খিচুড়ি, বিরিয়ানি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেন। কিছু কর্মী অন্যের ভরসায় না থেকে নিজেই চিঁড়ামুড়ি নিয়ে হাজির হন অনুষ্ঠানস্থলে। অনেককে কম্বল ও মশারি বিতরণ করতেও দেখা গেছে কর্মীদের মধ্যে। যারা অনুষ্ঠানের কাছাকাছি যেতে পারেননি, তাদের জন্য সড়কটির বিভিন্ন পয়েন্টে প্রজেক্টরের ব্যবস্থা করা হয়। মাইক পৌঁছে দেওয়া হয় বালু ব্রিজ পর্যন্ত। এদিকে জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সড়কটিতে বসে নানা অস্থায়ী খাবারের দোকান। ডিম-খিচুড়ি ১০০ টাকা, শুধু খিচুড়ি ৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া চটপটি, ফুচকা, চা-বিস্কুট, চিপস, বাদাম, বিরিয়ানির দোকান ছিল রাস্তার দুই পাশজুড়ে। জাতীয় পতাকা ও বিএনপির দলীয় পতাকা বিক্রি হতে দেখা গেছে সর্বত্র। অনেকে বিক্রি করেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ছবিসংবলিত কোটপিন। শীতের চাদর আর টুপিও বিক্রি হয় দেদার।
Reporter Name 





















