১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে মধু আহরণে ধস, পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:১৬:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • ২৬ Time View

সবুজদিন রিপোর্ট।।

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর চাহিদা বেড়েছে। তবে একই সময়ে সুন্দরবনে মধুর উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সুযোগে বাজারে ভেজাল মধুর বিস্তার ঘটেছে, যা জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ পণ্যের সুনামের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগে ২০২১ সালে ১০৪ দশমিক ৪ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে ১০৫ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ৯৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৪ সালে ১০০ মেট্রিক টন মধু আহরণ করা হয়। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৭ মেট্রিক টনে। আর ২০২৬ সালের সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে আহরণ হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

রাজস্বেও বড় ধাক্কা : মধু উৎপাদন কমে যাওয়ায় বন বিভাগের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কুইন্টাল মধুর জন্য ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং মোমের জন্য ২ হাজার ২০০ টাকা রাজস্ব নেওয়া হয়। ২০২২ সালে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল মধু ও ৬৯৬ কুইন্টাল মোম আহরণ থেকে প্রায় ৫২ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। তবে ২০২৫ সালে উৎপাদন কমে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে নেমে আসায় রাজস্ব কমে দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকায়। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মৌসুমে অনাবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বনদস্যুদের তৎপরতায় মধু আহরণ নেমে আসে ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টালে। এতে সরকারের মোট রাজস্ব এসেছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা, যার মধ্যে মধু থেকে আদায় হয়েছে ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টাকা। গত দুই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক রাজস্বও আদায় সম্ভব হয়নি।

দস্যু আতঙ্কে মৌয়ালদের দুর্ভোগ : উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি কেজি মধুর দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে দাম বাড়লেও লাভবান হতে পারেননি মৌয়ালরা। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ তাদের বড় সংকটে ফেলেছে। মৌয়াল ছগির হাওলাদার জানান, ১০ জনের দল নিয়ে মধু সংগ্রহে গেলে বনদস্যু মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে দুইজনকে অপহরণ করে। পরে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়াতে হয়। এতে ভয়ে তারা বন ছেড়ে ফিরে আসেন। আড়াই লাখ টাকা খরচ করেও মাত্র দুই মণ মধু সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে খলিশা, গরান ও কেওড়া গাছে পর্যাপ্ত ফুল ফোটেনি। এছাড়া অভয়ারণ্যের সীমানা বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময় তিন মাস থেকে কমিয়ে দুই মাস করায় মৌয়ালদের বন ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়েছে।

সমাধানের প্রস্তাব : সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি জাতীয় গৌরবের বিষয়। তাই মৌয়ালদের ‘গ্রিন ওয়ারিয়র’ হিসেবে স্বীকৃতি, কোস্ট গার্ডের সহায়তায় স্মার্ট পেট্রোলিং, সহজ শর্তে ঋণ ও বীমা সুবিধা এবং ভেজাল রোধে কিউআর কোডভিত্তিক সরকারি সিলমোহর চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বন বিভাগের বক্তব্য : সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের কারণে মৌয়ালরা গভীর বনের প্রধান মধু সংগ্রহ এলাকাগুলোতে যেতে পারেননি। এতে উৎপাদন ও রাজস্ব-দুটিই কমেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মোদি সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের পাশে এবার বলিউড তারকারা

সুন্দরবনে মধু আহরণে ধস, পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ

Update Time : ০৪:১৬:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

সবুজদিন রিপোর্ট।।

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর চাহিদা বেড়েছে। তবে একই সময়ে সুন্দরবনে মধুর উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সুযোগে বাজারে ভেজাল মধুর বিস্তার ঘটেছে, যা জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ পণ্যের সুনামের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগে ২০২১ সালে ১০৪ দশমিক ৪ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে ১০৫ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ৯৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৪ সালে ১০০ মেট্রিক টন মধু আহরণ করা হয়। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৭ মেট্রিক টনে। আর ২০২৬ সালের সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে আহরণ হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

রাজস্বেও বড় ধাক্কা : মধু উৎপাদন কমে যাওয়ায় বন বিভাগের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কুইন্টাল মধুর জন্য ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং মোমের জন্য ২ হাজার ২০০ টাকা রাজস্ব নেওয়া হয়। ২০২২ সালে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল মধু ও ৬৯৬ কুইন্টাল মোম আহরণ থেকে প্রায় ৫২ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। তবে ২০২৫ সালে উৎপাদন কমে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে নেমে আসায় রাজস্ব কমে দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকায়। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মৌসুমে অনাবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বনদস্যুদের তৎপরতায় মধু আহরণ নেমে আসে ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টালে। এতে সরকারের মোট রাজস্ব এসেছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা, যার মধ্যে মধু থেকে আদায় হয়েছে ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টাকা। গত দুই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক রাজস্বও আদায় সম্ভব হয়নি।

দস্যু আতঙ্কে মৌয়ালদের দুর্ভোগ : উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি কেজি মধুর দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে দাম বাড়লেও লাভবান হতে পারেননি মৌয়ালরা। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ তাদের বড় সংকটে ফেলেছে। মৌয়াল ছগির হাওলাদার জানান, ১০ জনের দল নিয়ে মধু সংগ্রহে গেলে বনদস্যু মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে দুইজনকে অপহরণ করে। পরে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়াতে হয়। এতে ভয়ে তারা বন ছেড়ে ফিরে আসেন। আড়াই লাখ টাকা খরচ করেও মাত্র দুই মণ মধু সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে খলিশা, গরান ও কেওড়া গাছে পর্যাপ্ত ফুল ফোটেনি। এছাড়া অভয়ারণ্যের সীমানা বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময় তিন মাস থেকে কমিয়ে দুই মাস করায় মৌয়ালদের বন ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়েছে।

সমাধানের প্রস্তাব : সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি জাতীয় গৌরবের বিষয়। তাই মৌয়ালদের ‘গ্রিন ওয়ারিয়র’ হিসেবে স্বীকৃতি, কোস্ট গার্ডের সহায়তায় স্মার্ট পেট্রোলিং, সহজ শর্তে ঋণ ও বীমা সুবিধা এবং ভেজাল রোধে কিউআর কোডভিত্তিক সরকারি সিলমোহর চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বন বিভাগের বক্তব্য : সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের কারণে মৌয়ালরা গভীর বনের প্রধান মধু সংগ্রহ এলাকাগুলোতে যেতে পারেননি। এতে উৎপাদন ও রাজস্ব-দুটিই কমেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।