রাঙামাটি প্রতিনিধি
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব ঐতিহ্যবাহী বিঝু, সাংগ্রই, বৈসুক বিহু, চাংক্রান, বিষু, চাংলান উৎসব আজ থেকে শুরু হচ্ছে। ঘরে ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন পাহাড়িরা। এরই মধ্যে বিঝুর জন্য বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে বিঝুর জন্য সবাই প্রস্তুত। ছোট শিশুদের পোশাক কেনা, বিঝুর প্রধান আকর্ষণ পাজন তরকারির জন্য নানা পদে সবজি ও শুঁটকি সংগ্রহ করছেন পরিবারের প্রধানরা। চারদিকে একটা খুশির আমেজ লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনদের জন্য বা আপনজনদের জন্য নতুন জামা কিনে পাঠিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ও পছন্দের জিনিস কিনতে কেউ কেউ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিঝু উপলক্ষে বিভিন্ন মেলা ও প্রতিযোগিতা পর্ব শেষ হয়েছে। গত ৬ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে উৎসব উপলক্ষে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল শোভাযাত্রা, পাজন রান্না প্রতিযোগিতা, আদিবাসী জুম্ম খেলাধুলা, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনাসভা, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী বলিহারা। বৃহত্তর সামাজিক ও জাতীয় উৎসবকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন নামে ডাকে। ভিন্ন নামে ডাকা হলেও এটি একই আমেজের সামাজিক উৎসব।
আজ ফুল বিঝু: আজ ভোর থেকে শিশুরা ফুলবাগান ও বনের নানা প্রজাতির ফুল সংগ্রহ করে নদীর ঘাটে পূজা দেবে ও প্রার্থনা করবে। সারাবছর সুন্দরভাবে কাটাতে পারায় প্রকৃতি, দেব-দেবী ও ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। শিশুদের পাশাপাশি তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষ ফুল দেয় নদীর তীরে। কেউ কেউ ভাসিয়েও দেয়। চাকমা বৌদ্ধরা অনেকেই জলবুদ্ধের উদ্দেশ্যেও ফুল নিবেদন করে।
ফুল বিঝুতে শিশুদের গোসল ও বিঝু ফল খাওয়া : ফুল বিঝুদের শিশুদের অবশ্যই পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়। এজন্য তাদের গোসল করা আবশ্যক। গ্রামে এ বিশ্বাস শিশুদের শোনানো হয় যেÑ ফুল বিঝুর দিন সকালে গোসল না করলে মৃত্যুর পর পরজন্মে শূয়র হয়ে জন্ম নিতে হয়। এ ছাড়া সকালে নদীতে ডুব দিয়ে গোসল করলে সুমিষ্ট ‘বিঝুগুলো’ (বিঝু ফল) খাওয়ার সৌভাগ্য লাভ হয়। পাহাড়ের এ চমৎকার আচরণগুলো শিশুকাল থেকে বাচ্চাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শিক্ষা দেয়। এ ছাড়া তরুণ-তরুণীরা ঘরে ঘরে গিয়ে বৃদ্ধা-বৃদ্ধদের গোসল করা। দূরের ছড়া কিংবা নদীর ঘাট থেকে কলসি নিয়ে পানি এনে বৃদ্ধা-বৃদ্ধদের গোসল করানোর মাধ্যমে পুণ্য সঞ্চয় হবে বলে মনে করা হয়।
আগামীকাল ১৩ এপ্রিল মূল বিঝু: মূল বিঝুতে ঘরে ঘরে নানাবিধ খাবার প্রস্তুত করে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। বিভিন্ন পদের সবজির সঙ্গে শুঁটকি মিশিয়ে পাজন তরকারি রান্না করে খাওয়ানো হয়। প্রতিটি ঘরেই এ বিশেষ খাবারটি পরিবেশন করা হয়। সাধারণত বুনো আলু, চিংড়ি মাছ, কাঁচা কাঁঠাল, শিমের বিচি, কচি বেত, ‘তারা’ নামে এক ধরনের পাহাড়ি তরকারি এবং গ্রীষ্মকালীন অন্যান্য সবজি মিশ্রণে পাজন তরকারি বানানো হয়। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। চাকমারা বিশ্বাস করেন, কমপক্ষে সাতটি বাড়িতে পাজন তরকারি খেলে বিভিন্ন জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যাবে। অনেকেই আনন্দ-উৎসবে মদপান করে নাচ-গান গেয়ে দলবেঁধে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। গভীর রাত পর্যন্ত চলে ঘোরাফেরা-আনন্দ-উচ্ছ্বাস। পাহাড়ি গ্রামাঞ্চলে তরুণ ও মাঝবয়সীরা দলবেঁধে ঘুরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সময় কাটান।
১৪ এপ্রিল গোজ্যাপোজ্যা দিন বা নুঅ বঝর : বাংলা নববর্ষ দিনটাকে চাকমারা বলে থাকেন গোজ্যাপোজ্যা দিন বা নুঅ বঝরের পত্থম দিন। এদিনেও মূল বিঝুর মতোই আয়োজন থাকে। আগেকার দিনে চাকমাদের মধ্যে সচ্ছল গৃহস্থরা শূয়র জবাই করে পুরো গ্রামের মানুষদের নিমন্ত্রণ করে ভাত খাওয়াতেন। তবে বর্তমানে এভাবে উদযাপন করা হয় না। বৌদ্ধ ধর্মীয় নীতির প্রভাবে এখন এই দিনে অনেকেই বৌদ্ধভিক্ষু বাড়িতে এনে কিংবা বুদ্ধ মন্দিরে গিয়ে নানা ধরনের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন ও প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে পাড়ার বয়স্কদের কাছে গিয়ে আশীর্বাদ নেন কনিষ্ঠরা। উৎসবের শেষ দিনটিতে একে অপরের সুখ-শান্তি কামনা করেন।
Reporter Name 























