অনলাইন ডেস্ক
১৯৬৫ সাল, শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে। চীন তখন সবেমাত্র পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা সেরেছে। এই পরিস্থিতিতে, চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ওপর নজরদারি চালাতে মরিয়া হয়ে ওঠে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ। তাদের পরিকল্পনা ছিল, ভারতের নন্দা দেবী পর্বতের চূড়ায় একটি বিশেষ পরমাণু-চালিত অ্যান্টেনা স্থাপন করা হবে, যা সরাসরি সীমান্ত সংলগ্ন চীনা ভূখণ্ডের ওপর দৃষ্টি রাখতে সাহায্য করবে।
এই গোপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য বেছে নেওয়া হলো আমেরিকান এবং ভারতীয় পর্বতারোহীদের একটি দলকে। তাদের প্রধান সামগ্রীর মধ্যে ছিল একটি অ্যান্টেনা, প্রয়োজনীয় তার ও একটি ১৩ কেজি ওজনের জেনারেটর। এর ভেতরেই ছিল প্লুটোনিয়াম, যা নাগাসাকিতে ব্যবহৃত বোমার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান তেজস্ক্রিয় উপাদান বহন করছিল।
কিন্তু, চূড়ান্ত আরোহণের ঠিক আগে প্রকৃতি রুদ্ররূপ নেয়। ভয়াবহ তুষারঝড় গ্রাস করে গোটা পর্বতকে। নীচে অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প থেকে ভারতীয় অফিসার ক্যাপ্টেন এম.এস. কোহলি আতঙ্কে রেডিওতে বার্তা পাঠান। তিনি বলেন, ক্যাম্প ফোর, শুনতে পাচ্ছ? … জলদি ফিরে এসো… এক মিনিটও নষ্ট করো না। তবে তিনি নির্দেশ দেন, যন্ত্রপাতি সুরক্ষিত করো। নিচে নিয়ে এসো না। জীবন বাঁচাতে অভিযাত্রীরা তখন ওই পারমাণবিক যন্ত্রটিকে ক্যাম্প ফোরের কাছে একটি বরফের খাঁজে লুকিয়ে রেখেই দ্রুত নিচে নেমে আসেন। সেই দিনের পর যন্ত্রটি আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরের বছর, দলটি যখন যন্ত্রটি উদ্ধারে ফেরে তখন তারা দেখে যে বরফ, পাথর আর যন্ত্রপাতি সমেত গোটা খাঁজটিই এক বিশাল তুষারধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সিআইএ কর্মকর্তারা তখন নাকি বলেছিলেন, ওহ ঈশ্বর, এটা খুব, খুব গুরুতর হবে! এগুলো প্লুটোনিয়াম ক্যাপসুল! বছরের পর বছর ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়, ব্যবহার করা হয় বিকিরণ শনাক্তকারী যন্ত্র এবং ইনফ্রারেড সেন্সর। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পর্বতারোহীরা পরে অনুমান করেছিলেন, প্লুটোনিয়াম জেনারেটরটি তেজস্ক্রিয় হওয়ায় উষ্ণ ছিল। উষ্ণতার কারণে সেটি সম্ভবত চারপাশের বরফ গলিয়ে আরও গভীরে, হিমবাহের মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র যদিও সরকারিভাবে এই অভিযানের কথা দীর্ঘদিন স্বীকার করেনি। কিন্তু ১৯৭৮ সালে এক সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই গোপন মিশনের কথা ফাঁস হয়ে যায়। এই খবর ভারতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই অত্যন্ত গোপনে এই হিমালয়ের যন্ত্রের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কিন্তু জনসমক্ষে দুই দেশই নীরবতা বজায় রাখে।
যারা এই যন্ত্রটি বহন করে পর্বতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা আজ প্রবীণ অথবা প্রয়াত। আমেরিকান পর্বতারোহী জিম ম্যাককার্থি আজও ক্ষোভে কাঁপেন। তার প্রশ্ন, গঙ্গায় মেশা হিমবাহের কাছে আপনারা প্লুটোনিয়াম ফেলে আসতে পারেন না! আপনারা জানেন গঙ্গার উপর কত মানুষ নির্ভরশীল?
প্রয়াত হওয়ার আগে ক্যাপ্টেন কোহলিও গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেছিলেন, সিআইএ আমাদের অন্ধকারে রেখেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল মূর্খের মতো, তাদের কাজ ছিল মূর্খের মতো… আর আমরা তাদের ফাঁদে পড়েছিলাম। গোটা ঘটনাটাই আমার জীবনের এক দুঃখজনক অধ্যায়।
৬০ বছর কেটে গেলেও গঙ্গোত্রী হিমবাহের উৎসস্থলে নন্দা দেবীর বরফের গভীরে সেই প্লুটোনিয়ামের তেজস্ক্রিয় উৎসটি আজও চাপা পড়ে আছে এক শীতল যুদ্ধের ব্যর্থ মিশন ও পরিবেশগত বিপদের নীরব সাক্ষী হয়ে।
সূত্র: এনডিটিভি
Reporter Name 
























