বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:
ইমার্জেন্সি এবং অপারেশন থিয়েটারে অজ্ঞান ওষুধ থেকে সুতা পর্যন্ত সকল সরঞ্জামাদি কিনতে হয় রোগীদের
ডাক্তার কর্মচারী নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটও তীব্র
রোগী ও স্বজনদের চোখে-মুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, আর ওয়ার্ডজুড়ে অতিরিক্ত রোগীর দমবন্ধ করা পরিবেশ
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার সূতিকাগার হচ্ছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষের প্রধান ভরসা এখন এই হাসপাতাল। সেই ভরসা এখন রূপ নিয়েছে ভোগান্তি আর হয়রানিতে। যেখানে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা এখন রীতিমত ভাইরাল ও ভয়ংকর। মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই এখানে। পদে পদে শুধু রোগী আর তাদের স্বজনদের নানা হয়রানির করুন আর্তনাদ।
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাসেবা ও উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি ৫০০ শয্যার একটি জেনারেল হাসপাতালে রূপ নিয়েছে।
হাসপাতালের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর লাইন। রোগী ও স্বজনদের চোখে-মুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, আর ওয়ার্ডজুড়ে অতিরিক্ত রোগীর দমবন্ধ করা পরিবেশ। কোথাও একটিমাত্র বেডে গাদাগাদি করে শুয়ে আছেন দুজন রোগী, কোথাও আবার মূল হাসপাতালের বারান্দায় বা মেঝেতে চলছে মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসা। নোংরা মেঝেতে বিছানা পেতে স্যালাইন নেওয়ার দৃশ্য এখন আর এই হাসপাতালের জন্য কোনো অস্বাভাবিক বা নতুন ঘটনা নয়। এটিই এই অঞ্চলের প্রতিদিনের চেনা বাস্তবতা।
সূত্রমতে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ অর্ধেকে নেমেছে। চিকিৎসক ও নার্সসহ তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। এতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালটিতে চাহিদার তুলনায় জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক, সাধারণ স্যালাইন ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ অনেক কমেছে। বিনামূল্যে রোগীদের পাওয়ার কথা থাকলেও, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। ডাক্তার দেখাতে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওয়ার্ডে সিট পেতে কষ্ট হয়। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক গরিব রোগীকে বেশি খরচে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও কর্মচারীর অনেক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে অনেক বেশি রোগী দেখতে হয়। এতে চিকিৎসকের পক্ষে প্রতিটি রোগীকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে জরুরি বিভাগ বা ইমার্জেন্সিতেও তিল ধারণের জায়গা থাকে না। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩৯৩ রোগী জরুরি চিকিৎসার জন্য আসেন। অথচ এই বিশালসংখ্যক মুমূর্ষু রোগীকে তাৎক্ষণিক সেবা দিতে ইমার্জেন্সি ডাক্তার আছেন মাত্র ছয়জন। এছাড়া পুরো হাসপাতালের জন্য ইমার্জেন্সি ওটি (অপারেশন থিয়েটার) রয়েছে মাত্র তিনটি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে কাক্সিক্ষত সেবা মিলছে না। দিনে মাত্র একবার ডাক্তার দেখতে আসেন। জরুরি প্রয়োজনে ডাকলে ইন্টার্ন চিকিৎসক বা নার্স আসতে চায় না। মাঝে মাঝে নার্সরাও বিরক্ত হন। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওষুধের সঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক চিকিৎসাযন্ত্র অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বন্ধ হয়ে গেছে। অচল এসব যন্ত্রের মধ্যে পালস অক্সিমিটার (শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপের যন্ত্র), নেবুলাইজারের (শ্বাসগ্রহণ যন্ত্র) মতো ছোট যন্ত্র যেমন রয়েছে; তেমনি সিটি স্ক্যান, পোর্টেবল এক্স-রে, ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মতো বড় ও দামি যন্ত্র রয়েছে। রেডিওলজি বিভাগে থাকা পাঁচটি এক্স-রে যন্ত্রের মধ্যে ৩/৪ টি প্রায়ই অচল থাকে। একই বিভাগে সিটি স্ক্যান যন্ত্র রয়েছে দুটি। এর মধ্যে একটি প্রায়ই নষ্ট থাকে।
কাগজে-কলমে হাসপাতালটির জেনারেল বেড ৫০০টি এবং মোট কেবিন রয়েছে ৩৮টি। কিন্তু এই সীমিত অবকাঠামো নিয়ে হাসপাতালটিকে প্রতিদিন বিশাল অঙ্কের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন অভ্যন্তরীণ বিভাগে (ইনডোর) গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন। অর্থাৎ, ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি চাপ নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম।
হাসপাতালের ভেতরে সরেজমিনে গিয়ে যে চিত্র দেখা গেছে, তা এককথায় ভয়াবহ। ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডোর, সিঁড়িঘর, এমনকি বাথরুমের ঠিক পাশটিতেও নোংরা পরিবেশে রোগী শুইয়ে রাখা হয়েছে। মূল ভবনের দোতলায় উঠতেই মনে হবে এটি কোনো চিকিৎসালয় নয়, বরং একটি উদ্বাস্তু শিবিরের ‘গণরুম’। বারান্দাজুড়ে সারি সারি রোগীর শয্যা পাতা। হাঁটার মতো ন্যূনতম জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই।
সাড়ে তিন কোটি মানুষের এই বিশাল হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়মিত কর্মচারী রয়েছেন মাত্র ১৬৭ জন (৮০+৮৭), যা দিয়ে এই বিশাল ভবনের পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা অসম্ভব। এছাড়া ২০টি আইসিইউ বেড সচল থাকলেও পুরো হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিরাপত্তাকর্মী আছেন মাত্র ১০ জন, যার কারণে চোর ও বহিরাগতদের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ ওষুধ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। সামর্থ্যবানরা কোনোভাবে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করাতে পারলেও দরিদ্র রোগীরা তা পারছে না। একইভাবে অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করাতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। সবচেয়ে দু:খজনক ঘটনা হচ্ছে ইমার্জেন্সিতে সূতা, গজ, ব্যান্ডজসহ আনুষাঙ্গিক সকল কিছু বাইরে থেকে এসব গরীব ও অসহায় রোগীদের পকেটের টাকা দিয়ে কিনতে হয়। রোগীর অপারেশনের জন্য এনেস্থেশিয়া ওষুধ সহ সবকিছুই স্লিপের মাধ্যমে বাইরে থেকে কিনতে হয়। এখানে রয়েছে আরেকটি শুভংকরের ফাঁকি। যেখানে সকল প্রকার মানবাধিকার হরণ করা হয়। অপারেশন শুরু হলে দফায় দফায় ওটি থেকে রোগীর স্বজনদের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক ওষুধ আনার জন্য স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়। ফলে ৮ হাজার টাকার ওষুধ পত্রের জায়গায় ১৫-২০ হাজার টাকা ওষুধ গজ ব্যান্ডেজ সূতা কিনতে হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম জানান, আমাদের সীমাবদ্ধতার পাহাড় অনেক বড়, কিন্তু তার মধ্যেই আমরা সাধ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। অচল যন্ত্রপাতির তালিকা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার ওষুধ আমরা পেয়েছি। কিছু অনিয়ম অব্যবস্থাপনার কথা অস্বীকার করবো না। তবে আমি যোগদানের পর থেকে চেষ্টা চালাচ্ছি।
Reporter Name 























