১০:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেয়েকে দাফন করে বাবা এলেন মোংলায় জামাইয়ের কবর দেখতে

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৪৭:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
  • ১৫৩ Time View

সবুজদিন রিপোর্ট।।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে বর, বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ ৯ জনকে মোংলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। নববধূ, তার বোন ও দাদিকে কয়রার নকশা এলাকায় এবং নানিকে দাফন করা হয় চালনা এলাকায়। অপরদিকে মাইক্রোবাস চালকের দাফন হয়েছে তার নিজ গ্রাম রামপালে
বাগেরহাটের রামপালের সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহতের ঘটনায় তৃতীয় দিনেও থামছে না স্বজনদের আহাজারি। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আত্মীয় স্বজনরা একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আর কিছুক্ষণ পর পর সবাই মিলে মোংলা কবরস্থানে যাচ্ছেন নিহত রাজ্জাকের পরিবারের সদস্য ও তাদের স্বজনরা। সেখানে মোনাজাতের পাশাপাশি নিহতদের কবর ছুঁয়ে দেখছেন তারা।

শনিবার (১৪ মার্চ) সারাদিন এভাবেই কেটেছে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়া এলাকার নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের জীবিত সদস্য ও তাদের আত্মীয়দের।

সকালে শেহালাবুনিয়া ছত্তারলেন সংলগ্ন আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির রাজ্জাকের বাড়ির সামনে মসজিদ থেকে আনা কয়েকটি খাটিয়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির আঙিনায় গভীর নীরবতা। কিছুক্ষণ পরপর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা যাচ্ছেন কবরস্থানে।

সেখানে গিয়ে প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন, কেউ কেউ কবরের মাটি ছুঁয়ে নিঃশব্দে কাঁদছেন।
এদিকে বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মিতুর বাবা আব্দুস সালাম খুলনার কয়রা থেকে মোংলা কবরস্থানে আসেন। সদ্য গড়া মেয়ের সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কবরের মাটির নিচে।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আব্দুস সালাম বলেন, আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার দুটো মেয়েই হারিয়ে গেলো। আমার বাবা অনেক আগেই মারা গেছে, এখন মা-ও নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
তাকে কাছে পেয়ে নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা আরও বেশি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে কবর স্থানে বসেই আকাশপানে চেয়ে আছেন দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ সদস্যকে হারানো আশরাফুল রহমান জনি। হারানোর কিছুই যে আর অবশিষ্ট নেই। এখন তিনি আর কান্না করছেন না। শোকে পাথর তিনি ।গাড়ির ভেতর থেকে বের করা বিভৎস স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, ভাই, বোন, ভাগনে-ভাগনির লাশও দেখেন। পরিবারের সবাইকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে পেছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন তিনি। তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন।
জনি বলেন, আসলে আমাদের আর কী বলার আছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। তবে সরকারের কাছে একটা কথা বলতে চাই, খুলনা-মোংলা মহাসড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোন মূল্যে নৌবাহিনীর বাসহ এই সড়কে চলাচল করা সব যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করছেন, নৌবাহিনীর স্টাফবাসটির অতিরিক্ত গতির কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে খুলনা–মোংলা মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে ঘটনার তিনদিন পার হলেও, এখন পর্যন্ত নিহতের স্বজনরা কোনো মামলা বা অভিযোগ করেননি। তবে অভিযোগ বা মামলা করলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফবাস ও যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মেয়েকে দাফন করে বাবা এলেন মোংলায় জামাইয়ের কবর দেখতে

Update Time : ১২:৪৭:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

সবুজদিন রিপোর্ট।।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে বর, বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ ৯ জনকে মোংলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। নববধূ, তার বোন ও দাদিকে কয়রার নকশা এলাকায় এবং নানিকে দাফন করা হয় চালনা এলাকায়। অপরদিকে মাইক্রোবাস চালকের দাফন হয়েছে তার নিজ গ্রাম রামপালে
বাগেরহাটের রামপালের সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহতের ঘটনায় তৃতীয় দিনেও থামছে না স্বজনদের আহাজারি। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আত্মীয় স্বজনরা একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আর কিছুক্ষণ পর পর সবাই মিলে মোংলা কবরস্থানে যাচ্ছেন নিহত রাজ্জাকের পরিবারের সদস্য ও তাদের স্বজনরা। সেখানে মোনাজাতের পাশাপাশি নিহতদের কবর ছুঁয়ে দেখছেন তারা।

শনিবার (১৪ মার্চ) সারাদিন এভাবেই কেটেছে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়া এলাকার নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের জীবিত সদস্য ও তাদের আত্মীয়দের।

সকালে শেহালাবুনিয়া ছত্তারলেন সংলগ্ন আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির রাজ্জাকের বাড়ির সামনে মসজিদ থেকে আনা কয়েকটি খাটিয়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির আঙিনায় গভীর নীরবতা। কিছুক্ষণ পরপর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা যাচ্ছেন কবরস্থানে।

সেখানে গিয়ে প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন, কেউ কেউ কবরের মাটি ছুঁয়ে নিঃশব্দে কাঁদছেন।
এদিকে বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মিতুর বাবা আব্দুস সালাম খুলনার কয়রা থেকে মোংলা কবরস্থানে আসেন। সদ্য গড়া মেয়ের সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কবরের মাটির নিচে।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আব্দুস সালাম বলেন, আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার দুটো মেয়েই হারিয়ে গেলো। আমার বাবা অনেক আগেই মারা গেছে, এখন মা-ও নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
তাকে কাছে পেয়ে নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা আরও বেশি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে কবর স্থানে বসেই আকাশপানে চেয়ে আছেন দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ সদস্যকে হারানো আশরাফুল রহমান জনি। হারানোর কিছুই যে আর অবশিষ্ট নেই। এখন তিনি আর কান্না করছেন না। শোকে পাথর তিনি ।গাড়ির ভেতর থেকে বের করা বিভৎস স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, ভাই, বোন, ভাগনে-ভাগনির লাশও দেখেন। পরিবারের সবাইকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে পেছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন তিনি। তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন।
জনি বলেন, আসলে আমাদের আর কী বলার আছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। তবে সরকারের কাছে একটা কথা বলতে চাই, খুলনা-মোংলা মহাসড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোন মূল্যে নৌবাহিনীর বাসহ এই সড়কে চলাচল করা সব যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করছেন, নৌবাহিনীর স্টাফবাসটির অতিরিক্ত গতির কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে খুলনা–মোংলা মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে ঘটনার তিনদিন পার হলেও, এখন পর্যন্ত নিহতের স্বজনরা কোনো মামলা বা অভিযোগ করেননি। তবে অভিযোগ বা মামলা করলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফবাস ও যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।