১০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ই-সিগারেট কি আসলেই নিরাপদ? ক্যানসার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • ৪ Time View

লাইফস্টাইল ডেস্ক

ই-সিগারেট বা ভেপ, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত তামাকজাত ধূমপানের একটি ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা গত এক দশকে আকাশচুম্বী হয়েছে, কারণ অনেকেই এটিকে একটি হানিকারক অভ্যাস বলে মনে করেন।

তবে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর গবেষকদের প্রকাশিত একটি নতুন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষকরা ভেপিংয়ের জৈবিক প্রভাব পরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, ই-সিগারেট ব্যবহার যতটা নিরাপদ ভাবা হয়েছিল, এটি আসলে ততটা নিরাপদ নয়। ভেপের অ্যারোসল বা বাষ্পে থাকা রাসায়নিকগুলো কোষের ক্ষতি, ডিএনএ মিউটেশন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করতে পারে—যা ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ।

নতুন এই পর্যালোচনায় কী পাওয়া গেছে?

কারেন্ট অনকোলজি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় মানবদেহের টিস্যুর ওপর ই-সিগারেটের প্রভাব সংক্রান্ত ল্যাবরেটরি এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান যে, ভেপিংয়ের বাষ্পে অত্যন্ত ক্ষতিকারক উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে ফরমালডিহাইড, অ্যাসিটালডিহাইড, অ্যাক্রোলিন, ভারী ধাতু এবং অতিসূক্ষ্ম কণা উল্লেখযোগ্য।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই উপাদানগুলো শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং ডিএনএ-র ক্ষতি করে।

মুখের ভেতর এবং শ্বাসনালীতে এমন কিছু সেলুলার বা কোষের পরিবর্তন দেখা গেছে, যা ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়। গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে, সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক কম থাকলেও ই-সিগারেট সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

ভেপিং কীভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে?

ক্যানসার মূলত তখন সৃষ্টি হয় যখন জিনগত মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটে এবং কোষের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়। ভ্যাপিং এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে প্রধানত তিনটি উপায়ে:

১. অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: যখন ক্ষতিকারক ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়। এটি ফুসফুস ও মুখের টিস্যুর ডিএনএ নষ্ট করে।

২. দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ: দীর্ঘস্থায়ী ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ ক্যানসারের একটি অন্যতম বড় কারণ। এটি অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং ডিএনএ মেরামতের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৩. ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করা: ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভেপের রাসায়নিক উপাদানগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত করে এবং শ্বাসনালীর প্রতিরক্ষামূলক স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মুখের ভেতরের অংশে ভেপিংয়ের বিরূপ প্রভাবের শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে, মুখগহ্বরের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও ভেপিংয়ের কারণে মুখের ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবুও ফ্লেভারযুক্ত ভেপিং পণ্যগুলো মুখের ভেতরের নরম টিস্যুতে তীব্র জ্বালাপোড়া ও কোষের ক্ষতি করছে বলে প্রমাণ মিলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে, ই-সিগারেট কোনোভাবেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি জানিয়েছে, অধূমপায়ী এবং তরুণদের কোনো অবস্থাতেই ভেপিং শুরু করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদী ডেটা বা পরিসংখ্যান নেই মানেই ভেপিং নিরাপদ—এমন ভাবাটা মস্ত বড় ভুল।’ ধীরে ধীরে যে প্রমাণগুলো সামনে আসছে, তা স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে যে ভেপের বাষ্প শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

সবশেষে ই-সিগারেট প্রচলিত সিগারেটের চেয়ে হয়তো কম ক্ষতিকর উপাদান ছড়ায়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি নিরাপদ।

তাই ‘ধূমপানের চেয়ে নিরাপদ’ মানেই যে এটি সম্পূর্ণ ‘ঝুঁকিমুক্ত’, এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার এবং সচেতনতা বাড়ানোর এখনই সময়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের সহায়তায় চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: পানিসম্পদমন্ত্রী

ই-সিগারেট কি আসলেই নিরাপদ? ক্যানসার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ

Update Time : ০৭:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

লাইফস্টাইল ডেস্ক

ই-সিগারেট বা ভেপ, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত তামাকজাত ধূমপানের একটি ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা গত এক দশকে আকাশচুম্বী হয়েছে, কারণ অনেকেই এটিকে একটি হানিকারক অভ্যাস বলে মনে করেন।

তবে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর গবেষকদের প্রকাশিত একটি নতুন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষকরা ভেপিংয়ের জৈবিক প্রভাব পরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, ই-সিগারেট ব্যবহার যতটা নিরাপদ ভাবা হয়েছিল, এটি আসলে ততটা নিরাপদ নয়। ভেপের অ্যারোসল বা বাষ্পে থাকা রাসায়নিকগুলো কোষের ক্ষতি, ডিএনএ মিউটেশন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করতে পারে—যা ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ।

নতুন এই পর্যালোচনায় কী পাওয়া গেছে?

কারেন্ট অনকোলজি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় মানবদেহের টিস্যুর ওপর ই-সিগারেটের প্রভাব সংক্রান্ত ল্যাবরেটরি এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান যে, ভেপিংয়ের বাষ্পে অত্যন্ত ক্ষতিকারক উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে ফরমালডিহাইড, অ্যাসিটালডিহাইড, অ্যাক্রোলিন, ভারী ধাতু এবং অতিসূক্ষ্ম কণা উল্লেখযোগ্য।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই উপাদানগুলো শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং ডিএনএ-র ক্ষতি করে।

মুখের ভেতর এবং শ্বাসনালীতে এমন কিছু সেলুলার বা কোষের পরিবর্তন দেখা গেছে, যা ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়। গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে, সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক কম থাকলেও ই-সিগারেট সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

ভেপিং কীভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে?

ক্যানসার মূলত তখন সৃষ্টি হয় যখন জিনগত মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটে এবং কোষের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়। ভ্যাপিং এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে প্রধানত তিনটি উপায়ে:

১. অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: যখন ক্ষতিকারক ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়। এটি ফুসফুস ও মুখের টিস্যুর ডিএনএ নষ্ট করে।

২. দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ: দীর্ঘস্থায়ী ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ ক্যানসারের একটি অন্যতম বড় কারণ। এটি অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং ডিএনএ মেরামতের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৩. ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করা: ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভেপের রাসায়নিক উপাদানগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত করে এবং শ্বাসনালীর প্রতিরক্ষামূলক স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মুখের ভেতরের অংশে ভেপিংয়ের বিরূপ প্রভাবের শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে, মুখগহ্বরের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও ভেপিংয়ের কারণে মুখের ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবুও ফ্লেভারযুক্ত ভেপিং পণ্যগুলো মুখের ভেতরের নরম টিস্যুতে তীব্র জ্বালাপোড়া ও কোষের ক্ষতি করছে বলে প্রমাণ মিলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে, ই-সিগারেট কোনোভাবেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি জানিয়েছে, অধূমপায়ী এবং তরুণদের কোনো অবস্থাতেই ভেপিং শুরু করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদী ডেটা বা পরিসংখ্যান নেই মানেই ভেপিং নিরাপদ—এমন ভাবাটা মস্ত বড় ভুল।’ ধীরে ধীরে যে প্রমাণগুলো সামনে আসছে, তা স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে যে ভেপের বাষ্প শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

সবশেষে ই-সিগারেট প্রচলিত সিগারেটের চেয়ে হয়তো কম ক্ষতিকর উপাদান ছড়ায়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি নিরাপদ।

তাই ‘ধূমপানের চেয়ে নিরাপদ’ মানেই যে এটি সম্পূর্ণ ‘ঝুঁকিমুক্ত’, এই বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসার এবং সচেতনতা বাড়ানোর এখনই সময়।