০৪:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুরার রোজা একটি নাকি দুইটি? হাদিসে যা বলা হয়েছে

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৫:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • ৭ Time View

ধর্ম ডেস্ক
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহরম। এটি শুধু একটি নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও ঈমানি অঙ্গীকার নবায়নেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। পবিত্র কুরআনে মহররমকে চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের প্রমাণ বহন করে। মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা, কারবালার ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এ মাস কেবল ইতিহাস স্মরণ করার সময় নয়; বরং নিজের জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলারও এক অনন্য সুযোগ। মহররম আমাদের এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা একজন মুমিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য স্মৃতিবিজড়িত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

অতএব এই মাসে যে যত বেশি নফল রোজা রাখতে পারেন এবং ইবাদতে মগ্ন হতে পারেন, তিনি তত বেশি সফল হতে পারবেন।

মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা মহররমের দশ তারিখ। ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং আহলে কিতাবদের মাঝেও এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তখন রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং কাবায় গিলাফ জড়াত।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমার জানা মতে, নবীজি আশুরার রোজার তুলনায় অন্য কোনো দিনের রোজার ফজিলত লাভের জন্য এত বেশি উদগ্রীব থাকতেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩২)

তিনি বলেছেন, ‘আশুরার রোজা বিগত এক বছরের পাপের কাফফারা হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

ইমাম বুখারি (রহ.) বিখ্যাত সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে মদিনার ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখেন।

নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করেন, এ দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা এতে রোজা পালন করো? তারা বলে, এই দিনটি মহান দিন, এ দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার সঙ্গীদের ফিরাউন থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি। ইহুদিদের জবাব শুনে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী। অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। (বুখারি: ৩৩৯৭; মুসলিম: ১১৩৯)

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি নির্দেশ করেছেন, তাই তার অনুসরণ করা আমাদের জন্য আবশ্যক।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রসুল, বিধর্মীরা তো এই দিনটিকে মহান দিন মনে করে। এই দিনে তারাও রোজা পালন করে। আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি তাহলে তো এদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের জবাবে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে, আগামী বছর ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব, ইনশাআল্লাহ। (মুসলিম: ১১৩৪)

আরেক বর্ণনায় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখে নিও। (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)’

উপরোক্ত হাদিসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, আশুরার রোজা দুটি রাখতে হবে। মহররমের ১০ তারিখ একটি আর এর আগে ৯ তারিখ অথবা পরে ১১ তারিখ আরও একটি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ মাসে যে কাজ হয়েছে, আ.লীগের ১৫ বছরেও হয়নি: মির্জা ফখরুল

আশুরার রোজা একটি নাকি দুইটি? হাদিসে যা বলা হয়েছে

Update Time : ১২:০৫:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ধর্ম ডেস্ক
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহরম। এটি শুধু একটি নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও ঈমানি অঙ্গীকার নবায়নেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। পবিত্র কুরআনে মহররমকে চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের প্রমাণ বহন করে। মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা, কারবালার ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এ মাস কেবল ইতিহাস স্মরণ করার সময় নয়; বরং নিজের জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলারও এক অনন্য সুযোগ। মহররম আমাদের এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা একজন মুমিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য স্মৃতিবিজড়িত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

অতএব এই মাসে যে যত বেশি নফল রোজা রাখতে পারেন এবং ইবাদতে মগ্ন হতে পারেন, তিনি তত বেশি সফল হতে পারবেন।

মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা মহররমের দশ তারিখ। ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং আহলে কিতাবদের মাঝেও এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তখন রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং কাবায় গিলাফ জড়াত।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমার জানা মতে, নবীজি আশুরার রোজার তুলনায় অন্য কোনো দিনের রোজার ফজিলত লাভের জন্য এত বেশি উদগ্রীব থাকতেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩২)

তিনি বলেছেন, ‘আশুরার রোজা বিগত এক বছরের পাপের কাফফারা হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

ইমাম বুখারি (রহ.) বিখ্যাত সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে মদিনার ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখেন।

নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করেন, এ দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা এতে রোজা পালন করো? তারা বলে, এই দিনটি মহান দিন, এ দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার সঙ্গীদের ফিরাউন থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি। ইহুদিদের জবাব শুনে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী। অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। (বুখারি: ৩৩৯৭; মুসলিম: ১১৩৯)

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি নির্দেশ করেছেন, তাই তার অনুসরণ করা আমাদের জন্য আবশ্যক।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রসুল, বিধর্মীরা তো এই দিনটিকে মহান দিন মনে করে। এই দিনে তারাও রোজা পালন করে। আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি তাহলে তো এদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের জবাবে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে, আগামী বছর ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব, ইনশাআল্লাহ। (মুসলিম: ১১৩৪)

আরেক বর্ণনায় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখে নিও। (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)’

উপরোক্ত হাদিসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, আশুরার রোজা দুটি রাখতে হবে। মহররমের ১০ তারিখ একটি আর এর আগে ৯ তারিখ অথবা পরে ১১ তারিখ আরও একটি।