বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:
জাল টাকার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পবিত্র ঈদুল আযহা সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও চক্রটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের হাট বাজার বিপনী বিতানগুলোতে পুশিং সেল করছে। জাল নোট প্রতিদিনই ব্যাংক বীমায় এবং দোকানপাটগুলোতে ধরা পড়ছে। সাধারণ মানুষ জাল নোটের চক্রে সর্বশান্ত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে ধরা পড়লেও জাল নোট চক্র বছরের পর বছর বহাল তবিয়াতে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় জাল টাকার বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোরবানীর ঈদকে কেন্দ্র করে পশুর হাটে বিপুল অঙ্কের নগদ লেনদেনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল নোট সরবরাহকারী সংঘবদ্ধ চক্র। ১০০, ৫০০ ও এক হাজার টাকার নোটের পাশাপাশি ২০ ও ৫০ টাকার জাল নোটও ছড়িয়ে দিচ্ছে চক্রগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে ২০ থেকে ২৫ সহযোগীর মাধ্যমে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে জাল নোটের বান্ডিল। এ ছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও কাজে লাগিয়ে বিক্রি করা হয় এসব জাল নোট। প্রতি লাখ বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। কমিশনের ভিত্তিতে কয়েকটি চক্র এসব নোট বাজারে বিক্রি করে।
সূত্রমতে, জাল নোটের ছোবলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি¤œ ও মধ্যবিত্তরা। তাদের কাছে এটি মরণ ব্যধির মতো। জাল নোট চোরাকারবারিরা ভারত থেকে তৈরী করে চোরাই পথে সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করায়। পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলার প্রতিটি হাট বাজার ও বিপনী বিতানগুলোতে। সাতক্ষীরা ও যশোরের ১৭টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ ভারতীয় পণ্যের মতো জাল টাকাও আসে। এক শ্রেনীর অসাধু আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় রমজান মাসে ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা ঢুকছে বানের পানির মত। জাল নোট তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত কয়েকটি ভাগে কাজ করে এই সিন্ডিকেট। প্রথমে অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি, দ্বিতীয় পর্যায়ে এগুলো যে অর্ডার দেয় তার কাছে পৌঁছে দেওয়া, তৃতীয় পর্যায়ে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতি ১০০ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ এক লাখ টাকা তৈরিতে তাদের খরচ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। সেই টাকা তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ৯ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে সেই টাকা বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষকে গছিয়ে দেয়। মাঠপর্যায়ে এ চক্রের কর্মীরা বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মাধ্যমে এই জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে থাকে। তবে জাল নোটের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে ব্যস্ততম হাট-বাজার ও বিপণিবিতানগুলিতে। এছাড়া সারা বছরই মাদকের লেনদেন, চোরাই পণ্যের কারবার, স্বর্ণ বেচাকেনাসহ বিভিন্ন অবৈধ লেনদেনে জাল নোট চালিয়ে দেয় এ চক্রের সদস্যরা।
পশুর হাটগুলো সহ জেলা শহরের মার্কেট, শপিং মল, ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় লেনদেনের সময় জাল নোটের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটে জালিয়াতির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলে তাদের দাবি। ব্যস্ত সময়ে তড়িঘড়ি লেনদেনের কারণে অনেক সময় নোট যাচাই করা সম্ভব হয় না, ফলে পরে হিসাব মেলাতে গিয়ে জাল টাকা ধরা পড়ছে।
খুলনার ব্যবসায়ী আলী আক্কাসের ভাষ্য মতে, ঈদ মৌসুমে ক্রেতার ভিড় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি লেনদেন সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে অসাধু চক্র কৌশলে জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া এবার নতুন নোটগুলো এমনভাবে বানানো যে চেনারই উপায় নাই। এতে একদিকে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বাস্তহারা এলাকার বাসিন্দা ইজিবাইক চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে এরা আমাদের মত নিরীহ মানুষদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলছে। কোন যাত্রী ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোট দিয়ে ভাড়া নিতে বললে আমরা ভয়ে থাকি। তবে এখন ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোটও জাল হচ্ছে। যা আমাদের মত নিম্ন আয়ের মানুষের ভয়ের সব থেকে বড় কারণ।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার তাজুল ইসলাম বলেন, ঈদ পূজা বা যেকোন উৎসব এলে জাল টাকা সরবরাহকারী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঈদ আসলে মার্কেটগুলোতে এই চক্র কৌশলে জাল নোট ঢুকিয়ে দেয়। জাল নোট ব্যবহার রোধে কেএমপি পুলিশের বিশেষ টিমের নজরদারীসহ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Reporter Name 






















