০৩:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় বাড়ছে ডায়রিয়া, ১৭ দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১৩৬৬

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:০২:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৬৩ Time View

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডায়রিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। গত ১৭ দিনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এক হাজার ৩৬৬ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে গড়ে আরও ৩০০-৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে অভিভাবকদের সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। শীতের শুরুতে আবহাওয়া পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করাই এই রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ।

এদিকে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হতে দেখা গেছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে ঠান্ডা মেঝেতেই শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ১ ডিসেম্বর ৬২ জন, ২ ডিসেম্বর ৭৫ জন, ৩ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৪ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৫ ডিসেম্বর ৮৮ জন, ৬ ডিসেম্বর ৯১ জন, ৭ ডিসেম্বর ৮৯ জন, ৮ ডিসেম্বর ৯৭ জন, ৯ ডিসেম্বর ৭১ জন, ১০ ডিসেম্বর ৬৮ জন, ১১ ডিসেম্বর ৭৪ জন, ১২ ডিসেম্বর ৮৮ জন, ১৩ ডিসেম্বর ১০৯ জন, ১৪ ডিসেম্বর ১০৯ জন, ১৫ ডিসেম্বর ৯০ জন এবং ১৬ ডিসেম্বর ৯৭ জন, ১৭ ডিসেম্বর ৯৮ জন রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সব মিলিয়ে গত ১৭ দিনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মোট এক হাজার ৩৬৬ জন ডায়রিয়া রোগী।

সরজমিনে সদর হাসপাতালে দেখা যায়, ওয়ার্ডে সামান্য পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই। মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের। সীমিত জনবল নিয়ে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক রোগী সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শীতের এই সময়ে ঠান্ডা মেঝেতে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে বসে থাকতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মায়েরা।

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর মা শাহিনা খাতুন জানান, তার দুই বছরের ছেলের হঠাৎ বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন কোনো বেড খালি নেই। ঠান্ডা মেঝেতেই শিশুকে নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।

আরেক অভিভাবক মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘রাতে শীত বেশি থাকায় মেঝেতে বাচ্চাকে নিয়ে থাকা খুব কষ্টের, তবুও উপায় নেই। গত ৩ দিন ধরে ছেলেকে নিয়ে আছি। রোগীদের প্রচুর চাপ। তবে ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের দায়িত্বরত একজন সিনিয়র নার্স বলেন, ‘শীতের শুরুতেই ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীদের চাপ বেড়ে যায়। আমাদের জনবল সংকট। তবুও আমরা দিনরাত অক্লান্তভাবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুর রহমান মালিক খোকন বলেন, ‘বর্তমানে সদর হাসপাতালে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেক শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে অভিভাবকদের সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। ডায়রিয়া খুব মারাত্মক নয়, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে পানিশূন্যতা শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোটা ভাইরাসে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল ভরসা ওরাল স্যালাইন।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। ছয় মাসের বেশি বয়সি শিশুদের নরম খাবার, কাঁচকলা ভর্তা, ডালের পানি খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর স্যালাইন খাওয়ানো বাধ্যতামূলক।’

এখনই সচেতন না হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস আমাদের সময়কে বলেন, ‘শীতের প্রভাবে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যার ফলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিয়েচিকিৎসাসেবা চালু রেখেছি।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসপাতালে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, ওয়ার্ড বয় গ্রেফতার

চুয়াডাঙ্গায় বাড়ছে ডায়রিয়া, ১৭ দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১৩৬৬

Update Time : ১০:০২:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডায়রিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। গত ১৭ দিনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এক হাজার ৩৬৬ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে গড়ে আরও ৩০০-৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে অভিভাবকদের সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। শীতের শুরুতে আবহাওয়া পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করাই এই রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ।

এদিকে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হতে দেখা গেছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে ঠান্ডা মেঝেতেই শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ১ ডিসেম্বর ৬২ জন, ২ ডিসেম্বর ৭৫ জন, ৩ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৪ ডিসেম্বর ৭৯ জন, ৫ ডিসেম্বর ৮৮ জন, ৬ ডিসেম্বর ৯১ জন, ৭ ডিসেম্বর ৮৯ জন, ৮ ডিসেম্বর ৯৭ জন, ৯ ডিসেম্বর ৭১ জন, ১০ ডিসেম্বর ৬৮ জন, ১১ ডিসেম্বর ৭৪ জন, ১২ ডিসেম্বর ৮৮ জন, ১৩ ডিসেম্বর ১০৯ জন, ১৪ ডিসেম্বর ১০৯ জন, ১৫ ডিসেম্বর ৯০ জন এবং ১৬ ডিসেম্বর ৯৭ জন, ১৭ ডিসেম্বর ৯৮ জন রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সব মিলিয়ে গত ১৭ দিনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মোট এক হাজার ৩৬৬ জন ডায়রিয়া রোগী।

সরজমিনে সদর হাসপাতালে দেখা যায়, ওয়ার্ডে সামান্য পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই। মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের। সীমিত জনবল নিয়ে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক রোগী সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শীতের এই সময়ে ঠান্ডা মেঝেতে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে বসে থাকতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মায়েরা।

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর মা শাহিনা খাতুন জানান, তার দুই বছরের ছেলের হঠাৎ বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন কোনো বেড খালি নেই। ঠান্ডা মেঝেতেই শিশুকে নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।

আরেক অভিভাবক মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘রাতে শীত বেশি থাকায় মেঝেতে বাচ্চাকে নিয়ে থাকা খুব কষ্টের, তবুও উপায় নেই। গত ৩ দিন ধরে ছেলেকে নিয়ে আছি। রোগীদের প্রচুর চাপ। তবে ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের দায়িত্বরত একজন সিনিয়র নার্স বলেন, ‘শীতের শুরুতেই ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীদের চাপ বেড়ে যায়। আমাদের জনবল সংকট। তবুও আমরা দিনরাত অক্লান্তভাবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুর রহমান মালিক খোকন বলেন, ‘বর্তমানে সদর হাসপাতালে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেক শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে অভিভাবকদের সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। ডায়রিয়া খুব মারাত্মক নয়, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে পানিশূন্যতা শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোটা ভাইরাসে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল ভরসা ওরাল স্যালাইন।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। ছয় মাসের বেশি বয়সি শিশুদের নরম খাবার, কাঁচকলা ভর্তা, ডালের পানি খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর স্যালাইন খাওয়ানো বাধ্যতামূলক।’

এখনই সচেতন না হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস আমাদের সময়কে বলেন, ‘শীতের প্রভাবে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যার ফলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিয়েচিকিৎসাসেবা চালু রেখেছি।’