বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:
টানা দুই বছর পর এবারের ঈদের লম্বা ছুটিতে সুন্দরবন হয়ে উঠবে অনিন্দ্য সুন্দর। পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝে তাই সাজ-সাজ রব। প্রকৃতির হাতের অকৃপণ সৃষ্টি নৈসার্গিক সৌন্দর্য্য অ্যাডভেঞ্চার ভয় ও শিহরণের অপরূপ নিদর্শন সুন্দরবন। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয়নাভিরাম চিত্রল হরিণ বানর সাপ নানা প্রজাতির মাছ ও বন্যপ্রাণীর অভয়শ্রম এই সুন্দরবন পর্যটকদের এক মন ভোলানো স্থান।
ঈদের ছুটিতে তাই মন মাতানো প্রকৃতি আর বন্যপ্রাণীর সংমিশ্রণের সমন্বয়ে নিম্নবৃত্ত থেকে শুরু করে বিত্তবানরা সবাই এই প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ভ্রমণ পিপাসু আর পর্যটকদের উপভোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বানরের চিৎকার চেঁচামেচি, হরেক পাখির দল, ময়ূরের কেকা ধ্বনী, অপরূপ চিত্রল হরিণের দলবেধে নদীর চরে অবাধ বিচরণ, বন মোরগের ডাক, কুমিরের রোদ পোহানো, মৌমাছির গুঞ্জন, বিশাল অজগর সাপ আর বিশ্বখ্যাত বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। প্রকৃতির এত হাতছানি ঈদের ছুটিতে কেউ হাতছাড়া করতে চাইছে না।
সুন্দরবনে ঘুরে দেখার মতো স্পটগুলো হলো শরণখোলার টাইগার পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত কটকা, কচিখালীর অভয়ারণ্যকেন্দ্র, করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজননকেন্দ্র, কলাগাছিয়ায় ইকোট্যুরিজম সেন্টার, হিরণপয়েন্ট খ্যাত নীলকমল অভয়ারণ্য, দুবলারচর, মানিকখালী, আন্দারমানিক ও দোবেকী এলাকায় পর্যাটকদের আনাগোনা বেশি থাকে।
সুন্দরবন ভ্রমনের জন্য সাধারণ দুই ধরনের প্যাকেজ রয়েছে। একদিনের প্যাকেজ এবং তিনদিনের প্যাকেজ। মংলা থেকে বিভিন্ন ধরনের জালি বোট এবং ট্যুরিষ্ট লঞ্চে করে করমজল হাড়বাড়িয়াসহ আশে পাশের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এট সম্ভব। এছাড়া খুলনার চালনা ও সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় ট্রলার এবং লঞ্চে করে একদিনের সফর সম্ভব। সেক্ষেত্রে মংলা থেকে পশুর নদ হয়ে করমজল- হাড়বাড়িয়া, খুলনা থেকে রূপসা শিবসা নদী হয়ে কালাবগি ও শেখেরটেক এবং সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাগাছিয়া ও দোবেকীতে ট্রলার নিয়ে ভ্রমন করা যায়। এছাড়া ট্যুরিষ্ট লঞ্চের ৩ দিনের প্যাকেজ অত্যান্ত মন মাতানো ভ্রমন।
পর্যটক বরণে প্রস্তুত ট্যুরিজম সংশ্লিষ্টরা। এতো উৎসাত উদ্দীপনা সাধারণত অন্যান্য সময় দেখা যায় না। এ সম্পর্কে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, পর্যটক বরণে প্রস্তুত সুন্দরবন। সুন্দরবনের পর্যটন স্পটগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ঈদের ছুটিতে যেসব পর্যটকরা সুন্দরবন ভ্রমণে আসবেন তাদের সার্বিক নিরাপত্তা দেবে বন বিভাগ। নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসহ বন প্রহরী থাকবেন তাদের সঙ্গে। এছাড়া সুন্দরবন এলাকায় র্যাব এবং কোষ্টগার্ডের নিয়মিত টহল অব্যাহত থাকবে।
ঈদুল আযহার ছুটিতে সুন্দরবনে ব্যাপক পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। সুন্দরবনে আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য এরই মধ্যে আবাসিক হোটেল বুকিং দিয়েছেন অনেকেই। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, টানা দুই বছর পর এবার তারা জমজমাট ব্যবসা করতে পারবেন।
করমজল পর্যটন স্পট ও বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, ঈদ ঘিরে সুন্দরবন দেখতে পর্যটকদের চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন হোটেল ও লঞ্চ, জালিবোট ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পর্যটক আসার খবর পাচ্ছেন। সেজন্য বনের অভ্যন্তরে করমজল, হারবাড়িয়া ইকোট্যুরিজম, কটকা ও কচিখালী পর্যটন কেন্দ্রগুলো অন্যরূপে সাজানো হয়েছে। করমজল পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নতুন করে এক কিলোমিটার আরসিসি ফুট ট্রেইল, একটি ঝুলন্ত ব্রিজ, দুটি গোলঘর, আকর্ষণীয় একটি তথ্যকেন্দ্রসহ নতুন নতুন অনেক স্থাপনা গড়ে তোলাসহ পর্যটক বরণে সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। এবার এ খাত থেকে দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় হবে বলেও জানান তিনি।
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ ফরিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মোংলার আহ্বায়ক নুর আলম বলেন, শুধু ঈদ নয়, সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখতে সবার মন চায়। তবে বিশেষ ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানে বাড়তি আনন্দ। এবার ঈদকে কেন্দ্র করে যেভাবে চাঙ্গা হয়েছে তাতে আগামী দুই বছরের মধ্যেই আগের মতোই সুন্দরবনের পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াবে।
এদিকে পর্যটকদের আকর্ষিত করার জন্য খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ঢাংমারি গ্রামের সুন্দরী ইকো রিসোর্ট, জঙ্গলবাড়িসহ ২০-২৫টি কটেজ, বাগেরহাটের মোংলার দক্ষিণ চিলায় বাদাবন ইকো কটেজ, কয়রার বানিয়াখালীতে নিশিকুরি রিসোর্ট, ইরাবতি ইকো রিসোর্টসহ সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বেশ কিছু কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে। কর্পোরেট, কাস্টমাইজড, ফ্যামিলি, স্টুডেন্ট, বাইকার সব ধরনের ট্যুরিস্টরা এখানে আসতে পারেন।
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে সম্পূর্ণ ইকো সিস্টেমে তৈরি কটেজ থেকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়া, ভয় ভয় অনুভূতি নিয়ে বনের ছোট খালে নৌকা ট্রিপ, ফিরে এসে কটেজের ফলগাছ থেকে বিভিন্ন জাতের দেশীয় ফল, পুকুরে অবাধ সাঁতার, বড়শি/জাল দিয়ে পুকুর অথবা ঘেরে মাছ ধরা, গ্রাম্য হাট, জেলে পল্লী ঘুরে সন্ধ্যায় কটেজের বিচ চেয়ারে বসে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায় বাদাবন ইকো কটেজে থেকে। রাতে খোলা আকাশের নিচে তাবুতে থেকে চাঁদ-তারার লুকোচুরির সঙ্গে বার-বি-কিউ পার্টি জমানো যায়।
Reporter Name 



















