লাইফস্টাইল ডেস্ক
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিগুলোর একটি হলো ‘আসাদো’ বা আর্জেন্টাইন বার্বিকিউ। খোলা জায়গায় কাঠ পুড়িয়ে মাংস গ্রিল করার এই সংস্কৃতি আবহমান কাল ধরে তাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই আয়োজনের জন্য কেবল আগুন, একটি গ্রিল এবং কয়েক টুকরো মাংসের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় স্থানীয় চমৎকার ম্যালবেক ওয়াইন এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা আড্ডা (সোব্রেমেসা)।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাংস পোড়ানোর এই গ্রামীণ অভিজ্ঞতা আজ বিশ্বমানের রন্ধনশিল্পে রূপ নিয়েছে, যা বিশ্বের সেরা তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে এবং দেশের তরুণ শেফদের উৎসাহিত করছে।
এক সময়ের সস্তা ও সাধারণ মানুষের খাবার থেকে আজকের বিশ্বখ্যাত ‘মিশেলিন গাইড’-এ স্থান করে নেওয়া—আসাদোর এই যাত্রাটি বেশ দীর্ঘ।
আর্জেন্টিনার এই প্রিয় ঐতিহ্যের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায়, এর সূচনা এমন কিছু মাংসের টুকরো দিয়ে হয়েছিল যা একসময় কারো পছন্দের তালিকায় ছিল না; বরং সেগুলো ছিল ব্রিটিশ রপ্তানি শিল্পের ফেলে দেওয়া অংশ।
‘আসাদো’র উত্থানের গল্প
আভিধানিক অর্থে ‘আসাদো’ শব্দটি একটি ক্রিয়াপদ, যার অর্থ পুড়ানো, গ্রিল করা বা বার্বিকিউ করা। তবে আর্জেন্টিনায় এর একটি তৃতীয় অর্থও রয়েছে—এটি গরুর পাঁজরের মাংসের একটি বিশেষ কাট, যা যেকোনো ভালো বার্বিকিউ আয়োজনের মূল আকর্ষণ।
১৯ শতকে আর্জেন্টিনায় যখন ব্রিটিশ মালিকানাধীন মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠে, তখন এই পাঁজরের অংশটিকে এক প্রকার বর্জ্য হিসেবেই গণ্য করা হতো। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো মূলত টিনজাত মাংস (যেমন: কর্নড বিফ) তৈরিতে বেশি আগ্রহী ছিল, যা যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের কাছে সহজে পাঠানো যেত।
পাঁজরের মাংসে হাড়ের পরিমাণ বেশি থাকায় এবং হাড় ছাড়ানোর খরচ বেশি হওয়ায় ব্রিটিশরা এটিকে বাদ দিয়ে দিত। লোকসান এড়াতে তারা এই অংশগুলো স্থানীয় কসাইখানায় সস্তায় বিক্রি করতে শুরু করে। দেশের বাইরে এর কোনো চাহিদা না থাকায় স্থানীয়রা এটিকে নিজেদের প্রধান খাবারে পরিণত করে, যা আজকের আসাদো ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
ফেলে দেওয়া অংশ থেকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে
আজকের আসাদোর প্রধান আকর্ষণগুলোর বেশিরভাগই একসময় সমাজের নিচু স্তরের খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল:
আচুরা (নাড়িভুঁড়ি ও ভেতরের অংশ): মল্লেজা (সুইটব্রেড), রিনিয়ন (কিডনি) এবং চিনচুলিনের (নাড়িভুঁড়ি) মতো অংশগুলো শুরুতে কসাইখানার দাসেরা খেত। আজ সেগুলো আসাদোর অন্যতম আভিজাত্যপূর্ণ অনুষঙ্গ।
এনত্রানিয়া (স্কার্ট স্টেক): কয়েক দশক ধরে এই পাতলা পেশিবহুল অংশটির কোনো বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না। কসাইরা এটি নিজেদের জন্য রেখে দিত বা সস্তায় বিক্রি করত।
১৯৯০-এর দশকে বাজারে এনত্রানিয়ার উদ্বৃত্ত দেখা দিলে মাংস ব্যবসায়ীরা বুয়েনস আইরেসের কোস্তানেরা নর্তের নদী তীরবর্তী ব্যস্ত গ্রিল রেস্তোরাঁগুলোতে এগুলো সরবরাহ করতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি গ্রাহকদের মন জয় করে এবং প্রিমিয়াম কাটে পরিণত হয়।
বিশ্বায়ন ও আধুনিক ‘অল্টারনেটিভ কাট’
বুয়েনস আইরেসের আধুনিক রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি এবং বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় আসাদো আজ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। তরুণ শেফ ও বুটিক কসাইদের হাত ধরে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের সঙ্গে মিল রেখে নতুন নতুন কাট যুক্ত হচ্ছে:
পিকানিয়া: আগে এটি সাধারণ ‘কুয়াদ্রিল’ (রাম্প) হিসেবে বিক্রি হতো। তবে ৯০-এর দশকে আর্জেন্টাইনরা যখন ব্রাজিলে ভ্রমণ শুরু করে এবং সেখানে ‘পিকানিয়া’র জনপ্রিয়তা দেখে, তখন থেকে এটি আর্জেন্টিনায়ও একটি বিশেষ প্রিমিয়াম কাট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
মারুচা: কাঁধের হাড়ের উপরের এই পেশিটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্ল্যাট আয়রন স্টেক’ ট্রেন্ডের অনুসরণে আর্জেন্টিনায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
টমাহক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল পরিচিত এই বড় হাড়সহ রিবআই কাটটি ৫-৬ বছর আগেও আর্জেন্টিনার কসাইখানায় অপরিচিত ছিল। ইন্টারনেট এবং বিশ্বায়নের কল্যাণে এটি এখন স্থানীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
মাইক্রো-কাট: উচ্চমানের রেস্তোরাঁগুলো এখন সাধারণ কাটের ভেতরেও নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে পরিবেশন করছে। যেমন—‘আসাদো দেল মেদিও’ (পাঁজরের মাঝের সেরা অংশ), ‘ওহো দে বাসিও’ (ফ্ল্যাঙ্কের ভেতরের অংশ) বা ‘সেহা’ (রিবআই-এর সবচেয়ে রসালো অংশ)।
সব মিলিয়ে, মাংসের টুকরোটি যেখান থেকেই আসুক না কেন, আর্জেন্টাইনদের কাছে আসাদো কেবল খাবার নয়—এটি একটি আবেগ।
Reporter Name 
























